মেসির পরের জীবন, ফুটবলেই বড় সাম্রাজ্য

আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও মাঠের বাইরেক্লাব মালিকানা, তরুণদের গড়ে তোলা ও ব্যবসায় আরও বড় পরিসরে যুক্ত হচ্ছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
টুইট ডেস্ক: আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিয়েছেন লিওনেল মেসি। মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলে জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ করলেও ফুটবল থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন না এই মহাতারকা। বরং খেলোয়াড়ি জীবনের পর তাঁর সামনে খুলে যাচ্ছে ক্লাব মালিকানা, তরুণ ফুটবলার গড়ে তোলা এবং ব্যবসা বিস্তারের নতুন অধ্যায়।
আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮তম ম্যাচ খেলে বিদায় নিয়েছেন মেসি। তবে ক্লাব ফুটবলে এখনই থামছেন না তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামির সঙ্গে তাঁর চুক্তি ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত। চুক্তিটি প্রতিবছর পর্যালোচনা করা হলেও শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত মনে করলে তা নবায়নের সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করেন তাঁর ঘনিষ্ঠরা।
ভবিষ্যতে কোচ হওয়ার চেয়ে ক্লাবের মালিক হওয়ার ভূমিকাই মেসির কাছে বেশি আকর্ষণীয়। তাঁর দৃষ্টিতে, কোচদের ভাগ্য অনেকটাই ম্যাচের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে মালিক হিসেবে কিছুটা আড়ালে থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ক্লাবের দিকনির্দেশনায় প্রভাব রাখা যায়।
মেসির সেই পরিকল্পনার বাস্তব ভিত্তিও তৈরি হয়েছে। স্পেনে গত এপ্রিলে পঞ্চম বিভাগের ইউই কর্নেয়া ক্লাব কিনেছেন তিনি। এরপর অক্টোবরে দ্বিতীয় বিভাগের সিডি এলদেন্সের নতুন মালিক হিসেবেও তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্পেনের ক্রীড়া পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো বাকি।
এলদেন্সকে ঘিরেই মেসির ফুটবল সাম্রাজ্যের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। আপাতত ক্লাবটির লক্ষ্য অবনমন এড়ানো। নতুন মালিকানা কাঠামোর পর দলটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ভিয়ারিয়ালের সাবেক কোচ হাভি কায়েহাকে।
মেসি নিজে এখনো খেলোয়াড় হিসেবে ব্যস্ত থাকায় বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে ক্লাবগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে দূর থেকেও এলদেন্সের ম্যাচগুলোর ওপর নজর রাখছেন তিনি। রিয়াল ওভিয়েদোকে ৪-১ গোলে হারানোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর প্রথম বার্তাতেই ক্লাবটির প্রতি সমর্থনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
মালিকানা ঘোষণার পরপরই মেসির ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হতে বেশ কয়েকটি পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান আগের মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করেও চুক্তিতে যেতে পারেনি। মেসির উপস্থিতি তাদের আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে।
স্পেনের পাশাপাশি উরুগুয়েতেও ক্লাব মালিকানায় যুক্ত আছেন মেসি। ২০২৫ সালের মে মাসে বন্ধু ও সাবেক সতীর্থ লুইস সুয়ারেজকে সঙ্গে নিয়ে ‘দেপোর্তিভো এলএসএম’ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। প্রথম মৌসুমেই দলটি দেশের তৃতীয় বিভাগে উঠে আসে। একাধিক ক্লাব নিয়ে বড় নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও এর জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় সেই উদ্যোগ আপাতত সীমিত রাখা হয়েছে।
মেসির বর্তমান বড় লক্ষ্য এলদেন্সকে স্পেনের সর্বোচ্চ ফুটবল প্রতিযোগিতা লা লিগায় প্রতিষ্ঠিত করা। ইন্টার মায়ামির সঙ্গেও তাঁর ভবিষ্যৎ সম্পর্ক রয়েছে। অবসর নেওয়ার পর চুক্তির অংশ হিসেবে ক্লাবটির কিছু মালিকানা পাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
তবে শৈশবের ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো পরিকল্পনা নেই। মেসির পারিবারিক ও পেশাগত জীবন এখন মূলত ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে। বার্সেলোনার সঙ্গেও তাঁর আবেগের সম্পর্ক অটুট রয়েছে।
তরুণ ফুটবলার তৈরির প্রতিও মেসির বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। অনূর্ধ্ব-১৬ দলগুলোর অংশগ্রহণে আয়োজিত ‘মেসি কাপ’-এ তিনি অর্থ ও সময়,দুটিই দিচ্ছেন। ২০২৫ সালে আটটি দল নিয়ে শুরু হওয়া এই আয়োজনের প্রতিটি ম্যাচে মেসির উপস্থিতি আয়োজকদেরও বিস্মিত করেছিল।
ফুটবলের বাইরে মেসির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যও বড় হয়েছে। গত জুনে ফোর্বসের হিসাবে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১১০ কোটি মার্কিন ডলার। গত এক বছরে ফুটবল ও ব্যবসা থেকে তাঁর আয় প্রায় ১৪ কোটি মার্কিন ডলার।
পোশাক ও ক্রীড়া সামগ্রী নির্মাতা অ্যাডিডাসের সঙ্গে তাঁর আজীবন চুক্তি রয়েছে। পাশাপাশি হোটেল ব্যবসা, আবাসন প্রকল্প, রেস্তোরাঁ এবং পানীয়পাত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তাঁর বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব রয়েছে। স্পেন ও আর্জেন্টিনায় তাঁর বিনিয়োগও বিস্তৃত হচ্ছে।
মেসির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনে বড় ভূমিকা ছিল তাঁর বাবা হোর্হে মেসির। গত আগস্টে ৬৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তার আগেই তিনি টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ, বিপণন, গণমাধ্যম ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বসহ মেসির ব্যবসা বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত করে গিয়েছিলেন।
এখন মেসির বিশ্বস্ত একটি দল এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। বার্সেলোনায় তাঁর শুরুর সময় থেকে সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরাই বিভিন্ন প্রস্তাব যাচাই করে তাঁর সামনে তুলে ধরেন। এরপর নিজের পছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন মেসি।
খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর বিদায় নিশ্চিত হলেও তাই মেসির গল্প শেষ হচ্ছে না। জাতীয় দলের অধ্যায়ের পর তিনি যে পথে এগোচ্ছেন, সেখানে ফুটবলই থাকছে কেন্দ্রবিন্দু,তবে এবার খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং ক্লাব মালিক, তরুণ প্রতিভার পৃষ্ঠপোষক এবং একজন বড় ব্যবসায়ী হিসেবে।
ব্যবসা নিয়েও নিজের আগ্রহের কথা মেসি আগেই জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, ব্যবসা তাঁকে আকর্ষণ করে এবং তিনি এখনো এ জগতের অনেক কিছু শেখার পর্যায়ে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর পর সেই শেখার সুযোগই হয়তো তাঁর জীবনের পরবর্তী বড় অধ্যায় হয়ে উঠবে।






