মেসি বিদায় নিলেন, থেকে গেলেন মেসি

জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচে এক গোল ও দুই গোলে সহায়তা; ২১ বছরের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষে আর্জেন্টিনার ফুটবলে রেখে গেলেন অনন্ত এক উত্তরাধিকার।
টুইট প্রতিবেদক: হাজারো মানুষের গর্জনে কেঁপে উঠেছিল আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসের স্মৃতিস্তম্ভ স্টেডিয়াম। শেষবারের মতো জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নামা লিওনেল মেসিকে বিদায় জানাতে গ্যালারিজুড়ে উঠেছিল একটাই ধ্বনি ‘মেসি, মেসি, মেসি’। আবেগে কাঁদছিলেন দর্শকেরা, কাঁদছিলেন মেসিও।
আর্জেন্টিনার হয়ে দুই দশকের বেশি সময়ের পথচলার শেষ ম্যাচটিও তাই নিছক একটি ফুটবল ম্যাচ হয়ে থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছিল একটি যুগের সমাপ্তির মুহূর্ত। যে মানুষটির সঙ্গে একটি প্রজন্মের বেড়ে ওঠা, সাফল্য-ব্যর্থতা আর স্বপ্ন জড়িয়ে আছে, তাঁকে বিদায় জানাতে স্টেডিয়ামে যেন এক হয়েছিল পুরো দেশ।
মাঠে নামার আগেই আবেগে ভেঙে পড়েছিলেন মেসি। স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বারবার চোখের পানি মুছছিলেন। জাতীয় দলের জার্সিতে কাটানো ২১ বছরের স্মৃতি যেন একের পর এক ফিরে আসছিল তাঁর চোখের সামনে।
মাঠে প্রবেশের সময়ও নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। গ্যালারির দর্শকেরা দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানালে হাত তুলে চারপাশের মানুষকে শেষবারের মতো অভিবাদন জানান তিনি। জাতীয় সংগীতের সময়ও তাঁর কণ্ঠে গান ছিল না; ছিল গভীর আবেগ।
বিদায়ী ম্যাচে অবশ্য আবেগের পাশাপাশি নিজের চেনা ফুটবলও উপহার দিয়েছেন মেসি। বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ে একটি গোল করেছেন তিনি, পাশাপাশি দুটি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন। প্রথমার্ধে নিকোলাস ওতামেন্দির গোলের সুযোগ তৈরি করে দেন মেসি। দ্বিতীয়ার্ধে নিকো পাজের গোলেও ছিল তাঁর অসাধারণ ভূমিকা। এরপর পেনাল্টি থেকে নিজেই গোল করে বিদায়ের রাতকে স্মরণীয় করে রাখেন।
এই গোলের মধ্য দিয়ে জাতীয় দলের হয়ে মেসির গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৬। শেষ ম্যাচেও সতীর্থদের ভালোবাসার কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। গোলের পর সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে দাঁড়ান, আর মেসি হাসিমুখে গ্রহণ করেন সেই শেষ উদ্যাপন।
মেসির এই বিদায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর শৈশবও। রোজারিওর ছোট্ট ছেলে লিও একসময় শুধু ফুটবল খেলতে চেয়েছিলেন। শৈশবে দাদি সেলিয়ার হাত ধরে মাঠে যেতেন। সেই ছোট্ট ছেলেটিই পরে হয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়।
তাঁর পথ অবশ্য কখনোই সহজ ছিল না। শারীরিক সমস্যার কারণে শৈশবেই বড় বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। এরপর স্পেনে পাড়ি, নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং বিশ্বসেরা ফুটবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার দীর্ঘ সংগ্রাম,সবকিছুর মধ্যেই তাঁর স্বপ্ন ছিল আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা।
একসময় সেই স্বপ্নই যেন ভেঙে যেতে বসেছিল। কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর ২০১৬ সালে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি। তীব্র সমালোচনা ও হতাশায় মনে হয়েছিল, আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর গল্প হয়তো অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
কিন্তু তিনি ফিরে এসেছিলেন। এরপরের গল্পটি যেন রূপকথা। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়, ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয় এবং পরবর্তী সময়েও আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে যাওয়া,সব মিলিয়ে মেসির আন্তর্জাতিক অধ্যায় পূর্ণতা পেয়েছে।
বিশ্বকাপ জয়ের পর তাঁর অবস্থান আরও অনন্য হয়ে ওঠে। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন। বয়স তাঁর গতি কিছুটা কমিয়েছে, কিন্তু ফুটবল বোঝার ক্ষমতা, নিখুঁত পাস, অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ এবং বড় মুহূর্তে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার সামর্থ্য হারায়নি।
মেসির বিদায় তাই শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়। এটি একটি প্রজন্মের আবেগের অবসান। তাঁর গোল, সহায়তা, শিরোপা ও অসংখ্য রেকর্ড নিয়ে হয়তো আগামী বহু বছর আলোচনা চলবে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা ও আর্জেন্টিনার প্রতি অটুট দায়বদ্ধতা।
জাতীয় দলের হয়ে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্তও তিনি নিজেকে উজাড় করে খেলেছেন। শেষ ম্যাচেও সেটিই করেছেন। বিদায়ের মুহূর্তে যেন আরও একবার প্রমাণ করলেন,মেসি শুধু একটি নাম নয়, একটি ফুটবল-অধ্যায়।
মেসি জাতীয় দল থেকে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবলে, তাঁর ভক্তদের হৃদয়ে এবং বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে মেসি থেকে যাবেন।






