তারাগঞ্জে মাদকের শেকড় কতদূর, হোম ডেলিভারিতে ব্যস্ত কারবারিরা

বাজার থেকে জনপদ, সেখান থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—গাঁজা-ইয়াবা-টাপেন্টাডলের পাশাপাশি নেশাজাতীয় সিরাপ বিক্রির অভিযোগ; মূল কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর: রংপুরের তারাগঞ্জে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক। উপজেলা সদর থেকে পাঁচ ইউনিয়নের বিভিন্ন বাজার, জনবসতি ও প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে মাদকের কারবার।
গাঁজা, ইয়াবা ও টাপেন্টাডলের পাশাপাশি ফেনসিডিল, ফেয়ারডিল, ইসকাফসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় সিরাপ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। মাদকের এমন সহজলভ্যতায় উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকেরা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের দামোদরপুর, ছিলাপাক বাজার ও বুড়িরহাট; কুর্শা ইউনিয়নের রহিমাপুর চাকলা ঘাট, অনন্তপুর, জিগারতলা, আদর্শগ্রাম ও শিয়ালডাঙ্গা; হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের বালাবাড়ি এবং ইকরচালী, বরাতিবাজার ও বামনদীঘিসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক বেচাকেনার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে মাদক কারবারিরা নানা কৌশলে এসব মাদক সরবরাহ করছে। বাজারকেন্দ্রিক বিক্রির পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকার নির্দিষ্ট কিছু স্থানকে মাদক লেনদেনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি। মোবাইল ফোনে যোগাযোগের পর চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে মাদক পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
মাছের কার্টনে সাড়ে ৭ কেজি গ্রাম গাঁজা
সম্প্রতি উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের চিকলী বাজারে মাছের কার্টনের ভেতর থেকে ৭ কেজি ৪০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। বিপুল পরিমাণ গাঁজা উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় মাদক সরবরাহের ধরন ও এর সঙ্গে জড়িতদের নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই গাঁজার চালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজনকে আটকের পর রহস্যজনক কারণে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে উদ্ধার হওয়া গাঁজার চালানটিকে পরিত্যক্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে বলেও দাবি তাদের।
এ ঘটনায় কাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কি না এবং উদ্ধার হওয়া গাঁজার বিষয়ে পুলিশের নথিতে কী উল্লেখ রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উদ্বেগে অভিভাবকেরা
মাদকের সহজলভ্যতায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে কিশোর ও তরুণদের নিয়ে। স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ, বাজার ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় মাদকের বিস্তার ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান প্রয়োজন।
তাদের আশঙ্কা, সহজে মাদক পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে কিশোর-তরুণদের একটি অংশ দ্রুত আসক্তির ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা।
মূল কারবারিরা কোথায়
সচেতন মহলের প্রশ্ন, এতগুলো এলাকায় নিয়মিত মাদক বিক্রির অভিযোগ থাকলেও এর সঙ্গে জড়িত মূল কারবারিরা কেন শনাক্ত হচ্ছে না? শুধু মাদক বহনকারী বা খুচরা বিক্রেতাকে আটক করে অভিযান সীমাবদ্ধ রাখলে সরবরাহব্যবস্থার মূল উৎস অক্ষত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয়দের দাবি, মাদকের উৎস, সরবরাহের পথ, অর্থের লেনদেন এবং নেপথ্যের মূল কারবারিদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগ পাওয়া এলাকাগুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
তারাগঞ্জে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, বরং সরবরাহের উৎস শনাক্ত, মূল কারবারিদের আইনের আওতায় আনা এবং মাদক বিক্রির অভিযোগ থাকা স্পটগুলোতে ধারাবাহিক নজরদারি কতটা কার্যকরভাবে করা হচ্ছে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।






