দুই সেট জামা থেকে তারকা সঞ্জীব কুমার , বন্ধুদের জন্য বিলিয়েছিলেন ৯৬ লাখ রুপি

অভাবের দিন পেরিয়ে খ্যাতির শিখরে উঠেও বদলায়নি অর্থের প্রতি সঞ্জীব কুমারের দৃষ্টিভঙ্গি; বন্ধু, কর্মী ও স্বজনদের প্রয়োজনে নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা।
টুইট প্রতিবেদক: একসময় হাতে ছিল মাত্র দুই সেট পোশাক। অভিনয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না, পরিবারেও ছিল তীব্র আর্থিক সংকট। সেই অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে বলিউডের অন্যতম স্মরণীয় অভিনেতা হয়ে উঠেছিলেন সঞ্জীব কুমার। তবে সাফল্য ও অর্থ তাঁর জীবনযাপনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারেনি।
চলচ্চিত্র সাংবাদিক হানিফ জাভেরির সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারের বরাত দিয়ে জানা যায়, বন্ধুদের প্রয়োজনে সঞ্জীব কুমার প্রায় ৯৬ লাখ রুপি ধার দিয়েছিলেন। এর বড় একটি অংশ আর ফেরতও পাননি। তবু অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে লিখিত নিশ্চয়তা বা আইনি নিরাপত্তার বিষয়টি তিনি গুরুত্ব দেননি।
সঞ্জীব কুমারের আসল নাম হরিহর জেঠালাল জারিওয়ালা। গুজরাটের পরিবার থেকে উঠে আসা এই অভিনেতা ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। মুম্বাইয়ে অভিনয়ের চেষ্টা শুরুর সময় তাঁর পরিবার ছিল অর্থকষ্টে। শুরুর দিকে এমন কিছু ছবিতেও অভিনয় করতে হয়েছে, যেগুলোকে পরবর্তী সময়ে নিম্নমানের বাণিজ্যিক ছবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তখন ছবির মান নয়, কাজ পাওয়াই ছিল তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কাজ মানেই ছিল পরিবারের জন্য অর্থের ব্যবস্থা। ধীরে ধীরে তাঁর অভিনয় প্রতিভা পরিচালকদের নজরে আসে। ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে তাঁর ক্যারিয়ারে পরিবর্তন শুরু হয়।
এরপর ‘খিলোনা’, ‘দস্তক’, ‘কোশিশ’, ‘মৌসম’, ‘আঁধি’, ‘ত্রিশূল’ ও ‘শোলে’র মতো ছবিতে অভিনয় করে নিজের অবস্থান তৈরি করেন সঞ্জীব। ‘কোশিশ’ ও ‘দস্তক’ ছবির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পান তিনি।
বন্ধুদের জন্য লাখ লাখ রুপি
অর্থের প্রতি সঞ্জীব কুমার কৃপণ ছিলেন—বলিউডে এমন ধারণা প্রচলিত থাকলেও হানিফ জাভেরির বর্ণনায় উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। নিজের অপ্রয়োজনীয় খরচে তিনি আগ্রহী ছিলেন না, কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে বন্ধু ও কাছের মানুষদের সাহায্য করতে পিছপা হতেন না।
অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহা তখন চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা তৈরির চেষ্টা করছেন এবং অর্থকষ্টে ছিলেন। হানিফের দাবি, সঞ্জীব তাঁকে প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ রুপি সাহায্য করেছিলেন। শুধু অর্থ দিয়েই নয়, প্রযোজকদের কাছেও শত্রুঘ্নর হয়ে কথা বলতেন তিনি।
প্রযোজক বনি কাপুরও একসময় সঞ্জীবের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন হানিফ। কোনো লিখিত কাগজপত্র ছাড়াই সেই অর্থ দেওয়া হয়েছিল। সঞ্জীবের মৃত্যুর পর বনি কাপুর অর্থটি তাঁর পরিবারের কাছে ফেরত দেন। এমনকি সঞ্জীবের পরিবারও জানত না যে তিনি বনি কাপুরকে অর্থ দিয়েছিলেন।
কর্মীর প্রতিও ছিল দায়িত্ব
বন্ধুদের পাশাপাশি নিজের কর্মীদের প্রতিও যত্নশীল ছিলেন সঞ্জীব। তাঁর গাড়িচালকের বিয়ের খরচ তিনি বহন করেছিলেন বলে জানা যায়। মৃত্যুর আগে করা উইলে ওই চালকের ছেলের পড়াশোনার জন্য দুই লাখ রুপি রেখে গিয়েছিলেন বলেও জানিয়েছেন হানিফ।
এসব ঘটনায় সঞ্জীবের অর্থ ব্যবহারের একটি আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়। নিজের জন্য সঞ্চয়ের চেয়ে প্রয়োজনের সময়ে অন্যের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন।
বিয়ে করেননি সঞ্জীব
সঞ্জীব কুমারের ব্যক্তিজীবনেও ছিল নানা আলোচিত অধ্যায়। হেমা মালিনী, নূতন ও সুলক্ষণা পণ্ডিতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। বিশেষ করে সুলক্ষণা পণ্ডিত তাঁকে বিয়ে করতে চাইলেও সঞ্জীব বিয়েতে রাজি হননি।
হানিফ জাভেরির দাবি, সঞ্জীব মনে করতেন তাঁর জীবন দীর্ঘ হবে না। পরিবারের কয়েকজন পুরুষ সদস্য ৫০ বছর বয়সের আগেই মারা যাওয়ায় তাঁর মধ্যেও এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে তাঁর দুটি হৃদ্রোগের ঘটনাও ঘটেছিল। তাই বিয়ে করে কোনো নারীর জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে চাননি তিনি,এমনটাই হানিফের বক্তব্য।
শেষ পর্যন্ত ১৯৮৫ সালের ৬ নভেম্বর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মারা যান সঞ্জীব কুমার।
অভাব থেকে উঠে এসে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছালেও অর্থ তাঁর কাছে কখনো পরিচয়ের মাপকাঠি হয়ে ওঠেনি। পর্দায় ‘শোলে’র ঠাকুর থেকে ‘কোশিশ’-এর হরি,বিভিন্ন চরিত্রে নিজের অভিনয়ের গভীরতা দিয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। আর পর্দার বাইরের জীবনে বন্ধু, কর্মী ও কাছের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিককে স্মরণীয় করে রেখেছে।






