এক সিনেমার দুই সমাপ্তি, শতবর্ষে গার্বোর ‘দ্য টেম্পট্রেস’

শত বছর আগে মুক্তি পাওয়া ছবিটি ঘিরে পরিচালক বদল, গার্বোর তারকা হয়ে ওঠার সূচনা এবং দুটি ভিন্ন সমাপ্তির গল্প আজও কৌতূহল জাগায়।
টুইট প্রতিবেদক: ১৯২৬ সালের ৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পেয়েছিল ‘দ্য টেম্পট্রেস’। গ্রেটা গার্বোর হলিউড জীবনের শুরুর দিকের এই নির্বাক চলচ্চিত্র আজ পূর্ণ করল ১০০ বছর। শতবর্ষ পেরিয়েও ছবিটি চলচ্চিত্র ইতিহাসে আলাদা হয়ে আছে পরিচালক পরিবর্তন, গার্বোর তারকা হয়ে ওঠার শুরুর অধ্যায় এবং একই ছবির দুটি ভিন্ন সমাপ্তির কারণে।
‘দ্য টেম্পট্রেস’ ছিল গার্বোর দ্বিতীয় আমেরিকান চলচ্চিত্র। এর আগে ‘দ্য টরেন্ট’ দিয়ে হলিউডে অভিষেক হয়েছিল তাঁর। দুটি ছবিরই উৎস ছিলেন স্প্যানিশ ঔপন্যাসিক ভিসেন্তে ব্লাসকো ইবানিয়েস। তাঁর ১৯২২ সালের উপন্যাস ‘লা তিয়েরা দে তোদোস’ অবলম্বনে নির্মিত হয় ‘দ্য টেম্পট্রেস’।
ছবিতে গার্বোর চরিত্র এলেনা। প্যারিসের এক মুখোশের অনুষ্ঠানে আর্জেন্টাইন প্রকৌশলী ম্যানুয়েল রোব্লেদোর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। প্রথম দেখাতেই তৈরি হয় আকর্ষণ। পরে রোব্লেদো জানতে পারেন, এলেনা তাঁর পরিচিত মার্কুইস দে তোরে বিয়াঙ্কার স্ত্রী। এরপর প্রেম, ঈর্ষা, আকাঙ্ক্ষা ও বিপর্যয়ের গল্প এগিয়ে যায় প্যারিস থেকে আর্জেন্টিনায়।
গার্বোর বিপরীতে ম্যানুয়েল রোব্লেদোর চরিত্রে অভিনয় করেন আন্তোনিও মোরেনো। ছবিতে আরও ছিলেন লায়োনেল ব্যারিমোর, মার্ক ম্যাকডারমট, আরমান কালিজ ও রয় ডি’আর্সি।
পরিচালক বদলের নাটক
‘দ্য টেম্পট্রেস’-এর ক্যামেরার পেছনের ঘটনাও ছিল নাটকীয়। ছবিটির পরিচালনা শুরু করেছিলেন সুইডিশ নির্মাতা মরিত্জ স্টিলার। তরুণ গার্বোর প্রতিভা প্রথম দিকে যাঁরা চিনেছিলেন, স্টিলার ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তাঁর ‘দ্য সাগা অব গোস্তা বেরলিং’ ছবিতে অভিনয়ের পরই গার্বো আন্তর্জাতিকভাবে নজরে আসেন।
১৯২৬ সালের ৩ এপ্রিল ছবিটির মূল শুটিং শুরু হয়। কিন্তু এক মাসের মধ্যেই স্টিলারকে সরিয়ে ফ্রেড নিবলোকে দিয়ে ছবিটি শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয় স্টুডিও কর্তৃপক্ষ।
স্টিলারের কাজের ধরণ, শুটিংয়ের গতি, ভাষাগত সমস্যা ও ব্যয় নিয়ে এমজিএমের অসন্তোষের কথা বিভিন্ন নথিতে পাওয়া যায়। গার্বো এই ঘটনায় হতাশ হয়েছিলেন। এমনকি হলিউড ছেড়ে সুইডেনে ফিরে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত তিনি হলিউডেই থেকে যান। এরপর ‘ফ্লেশ অ্যান্ড দ্য ডেভিল’ ছবিতে জন গিলবার্টের বিপরীতে অভিনয় করে দ্রুত বড় তারকা হয়ে ওঠেন।
২০ বছরের গার্বো
‘দ্য টেম্পট্রেস’-এর শুটিংয়ের সময় গার্বোর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। নির্বাক চলচ্চিত্র হওয়ায় তাঁর কোনো সংলাপ ছিল না। চোখ, মুখের অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষার মাধ্যমেই চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে হয়েছিল তাঁকে।
ছবিটির চিত্রগ্রহণে ছিলেন টনি গাউদিও ও উইলিয়াম ড্যানিয়েলস। আলো-ছায়া ও ক্লোজআপে গার্বোর মুখের ব্যবহার তাঁর পরবর্তী রহস্যময় পর্দা-ব্যক্তিত্ব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এক ছবির দুই সমাপ্তি
‘দ্য টেম্পট্রেস’-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো এর দুটি সমাপ্তি।
একটি সমাপ্তি ছিল বিষাদময়। সেখানে কয়েক বছর পর রোব্লেদো এলেনাকে দেখতে পান। তত দিনে এলেনার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। একসময়ের আকর্ষণীয় নারী তখন ভগ্ন ও নিঃস্ব।
অন্য সমাপ্তিতে রাখা হয়েছিল তুলনামূলক সুখের পরিণতি। সেখানে এলেনা ও রোব্লেদোর পুনর্মিলনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
তৎকালীন দর্শকদের পছন্দের কথা বিবেচনা করে ছবির মূল বিষাদময় সমাপ্তির পাশাপাশি বিকল্প সমাপ্তি তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে চলচ্চিত্র ইতিহাসভিত্তিক নথিতে উল্লেখ আছে। পরবর্তী সময়ে দুটি সমাপ্তিরই অস্তিত্ব সংরক্ষিত হয়।
শত বছর পরও টিকে আছে ছবি
নির্বাক যুগের বহু চলচ্চিত্র সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। নেগেটিভ ও প্রিন্ট নষ্ট হওয়া, আগুনে পুড়ে যাওয়া কিংবা সংরক্ষণের অভাবে অসংখ্য ছবি আর পাওয়া যায় না। তবে ‘দ্য টেম্পট্রেস’ সেই তালিকায় নেই।
চলচ্চিত্রবিষয়ক তথ্যভান্ডার ‘সাইলেন্ট এরা’র তথ্য অনুযায়ী, ছবিটির ৩৫ মিলিমিটার প্রিন্টের অস্তিত্ব রয়েছে। পরে এটি ঘরোয়া ভিডিওতেও প্রকাশিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের সংগ্রহেও ছবিটির ১৯২৬ সালের স্বত্ব নিবন্ধনের তথ্য সংরক্ষিত আছে।
‘দ্য টেম্পট্রেস’-এর পর গার্বোর ক্যারিয়ার দ্রুত এগিয়ে যায়। ‘ফ্লেশ অ্যান্ড দ্য ডেভিল’, ‘লাভ’, ‘আ ওম্যান অব অ্যাফেয়ার্স’ পেরিয়ে তিনি সবাক চলচ্চিত্রের যুগেও সাফল্য ধরে রাখেন। ‘আনা ক্রিস্টি’, ‘গ্র্যান্ড হোটেল’, ‘কুইন ক্রিস্টিনা’, ‘কামিল’ ও ‘নিনোচকা’র মতো ছবি তাঁকে চলচ্চিত্র ইতিহাসের কিংবদন্তিতে পরিণত করে।
শত বছর পর ‘দ্য টেম্পট্রেস’ তাই শুধু একটি পুরোনো নির্বাক চলচ্চিত্র নয়। এটি গার্বোর তারকা হয়ে ওঠার শুরুর সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যে ছবির নির্মাণপর্বে পরিচালক বদল হয়েছিল, যে ঘটনায় তরুণ গার্বো হলিউড ছেড়ে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন এবং যে ছবির জন্য তৈরি হয়েছিল দুটি ভিন্ন সমাপ্তি,এক শতাব্দী পরও সেই গল্প চলচ্চিত্রপ্রেমীদের আগ্রহ ধরে রেখেছে।






