জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ল, সরকারের যুক্তি কী

আন্তর্জাতিক বাজারে দ্বিগুণের বেশি মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেও পাঁচ মাস দেশের বাজারে দাম অপরিবর্তিত; বিপিসির ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার লোকসান, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও পাচার ঠেকাতে মূল্য সমন্বয়।
বিশেষ প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পরও দেশের সাধারণ মানুষের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ না দিতে কয়েক মাস জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছিল সরকার। কিন্তু এতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান দ্রুত বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে সমন্বয় করা হয়েছে।
নতুন দরে ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ২০ সেপ্টেম্বরের বিজ্ঞপ্তিতে নতুন মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি জানানো হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ
সরকারের মূল্য সমন্বয়ের প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজ ভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের বড় আমদানিকারক দেশ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানি ব্যয়ে। এর সঙ্গে জাহাজ ভাড়া ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় দেশে আগের দামে জ্বালানি বিক্রি করা বিপিসির জন্য ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
পাঁচ মাসে বিপিসির লোকসান ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলেও জনস্বার্থ বিবেচনায় সরকার এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখে। এর ফলে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছিল বলে সরকারি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু ডিজেল বিক্রিতেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারত। দৈনিক লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১০৯ কোটি টাকা হিসাব করা হয়েছে।
অর্থাৎ নতুন মূল্য সমন্বয় কেবল ভোক্তার ওপর অতিরিক্ত ব্যয় চাপানোর সিদ্ধান্ত নয়; বিপিসির ক্রমবর্ধমান আর্থিক ক্ষতি নিয়ন্ত্রণেরও একটি পদক্ষেপ।
দাম বাড়িয়েও পুরো ভর্তুকি প্রত্যাহার হয়নি
সরকারি ব্যাখ্যায় আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মূল্য বাড়ানোর পরও আন্তর্জাতিক বাজারদরের পুরোটা ভোক্তার ওপর চাপানো হয়নি। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী আনিন্দ্য ইসলাম আমিত জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের বর্তমান ব্যয় লিটারপ্রতি প্রায় ১৭০ টাকা হলেও দেশের নতুন খুচরা মূল্য ১৩৫ টাকা। অর্থাৎ মূল্য সমন্বয়ের পরও ডিজেলে বিপিসিকে প্রতি লিটারে কার্যকরভাবে প্রায় ১৫ টাকা ভর্তুকি বহন করতে হচ্ছে।
এ থেকে বোঝা যায়, সরকার একদিকে বিপিসির লোকসান কমানোর চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের পুরো ব্যয় একবারে ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেয়নি।
বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের প্রয়োজন
বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ টন পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানি করে, যার মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ টন ডিজেল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর সরাসরি চাপ তৈরি হয়।
এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে বিপিসির লোকসান কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। আমদানি ব্যয় ও সরকারি ভর্তুকির চাপ কমানো বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সীমান্তপথে পাচার ঠেকাতেও মূল্য সমন্বয়
সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো জ্বালানি পাচার। বাংলাদেশে জ্বালানির দাম প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় কম থাকায় সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল বলে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে।
সরকারের তুলনামূলক হিসাবে বাংলাদেশে নতুন দরে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা। কলকাতায় সমপরিমাণ মূল্য ১৩৪ দশমিক ৭৬ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৪ দশমিক ৮৩ টাকা, নেপালে ১৬১ দশমিক ২৪ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ দশমিক ৪২ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১ দশমিক ২২ টাকা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা এবং পাকিস্তানে ১৮৫ দশমিক ৪৮ টাকা সমপরিমাণ বলে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে।
সরকারের যুক্তি হলো, দেশের বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করা জ্বালানি যদি কম দামে সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে চলে যায়, তাহলে এর আর্থিক ক্ষতি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিকেই বহন করতে হয়। মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে সেই ঝুঁকি কমানোও সিদ্ধান্তটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
ভর্তুকি কমিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি খাতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারের ব্যয়ও বেড়েছে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, জ্বালানি খাতে সীমাহীন ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যয়, বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনায় চাপ তৈরি হতে পারে। তাই বিপিসির লোকসান নিয়ন্ত্রণে আনা এবং সরকারি অর্থের ওপর চাপ কমানো প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমতে পারে
সরকারের হিসাবে, প্রতি লিটার জ্বালানিতে ২০ টাকা করে মূল্য সমন্বয়ের ফলে বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে।
অর্থাৎ সরকার পুরোপুরি ভর্তুকি প্রত্যাহার না করে এমন একটি পর্যায়ে দাম সমন্বয় করেছে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ মোকাবিলা করা যায় এবং বিপিসির আর্থিক ক্ষতির লাগাম টানা সম্ভব হয়।
কেন এখন সিদ্ধান্তটি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে
জ্বালানি তেল বাংলাদেশের পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হলে দেশের বাজারে দাম অপরিবর্তিত রাখার অর্থ হলো সেই অতিরিক্ত ব্যয় সরকারি কোষাগার বা বিপিসির ওপর চাপিয়ে দেওয়া।
মার্চ থেকে আগস্টের পাঁচ মাসেই ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার বেশি লোকসান তার একটি বাস্তব উদাহরণ। একই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বছরে শুধু ডিজেলেই প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা ছিল।
এই বাস্তবতায় সরকার যে ২০ টাকা মূল্য সমন্বয় করেছে, তা আন্তর্জাতিক বাজারের পুরো বাড়তি ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং বিপিসির লোকসান, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, সীমান্তপথে পাচার এবং সরকারি ভর্তুকির ভার—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে একটি সীমিত সমন্বয়।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ে চাপ তৈরি হতে পারে—এটি বাস্তব। তবে সরকারের বিবেচনায় বিপিসির ক্রমবর্ধমান লোকসান অব্যাহত রাখা এবং তার পুরো ভার সরকারি অর্থায়নে বহন করাও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। ফলে বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে লোকসান ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগকে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।






