বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় সাইবার স্ক্যামের আড়ালে মানবপাচার, ইইউর সতর্কতা

বাংলাদেশে সাইবার স্ক্যাম নিয়ে ইইউ-ইউএনওডিসির সতর্কতা। ভুয়া চাকরির প্রলোভনে পাচারের পর অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করার তথ্য; ভুক্তভোগী শনাক্ত ও সুরক্ষায় জোর।
টুইট প্রতিবেদক: সাইবার স্ক্যাম বা অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের জোরপূর্বক যুক্ত করার প্রবণতা নিয়ে নতুন আঞ্চলিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি)। ইইউ বাংলাদেশ মিশন ২০ সেপ্টেম্বর (রোববার) এক্সে দেওয়া পোস্টে প্রতিবেদনটির কথা প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনটির আনুষ্ঠানিক উন্মোচন ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (বুধবার) ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়।
সাম্প্রতিক এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের প্রতারণার মাধ্যমে পাচার করে সাইবার স্ক্যাম পরিচালনায় বাধ্য করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যক্তিকে ভুক্তভোগী হিসেবে শনাক্ত না করে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
‘ট্রাফিকড টু স্ক্যাম: সাউথ এশিয়ান রেসপন্সেস টু ট্রাফিকিং ইন পারসন্স ফর দ্য পারপাস অব ফোর্সড ক্রিমিনালিটি ইন স্ক্যাম অপারেশনস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি গত সপ্তাহে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকার, ইইউ, ইউএনওডিসি এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অংশীদাররা অংশ নেন।
প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা—এই পাঁচটি দেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দক্ষিণ এশিয়াকে সাইবার স্ক্যাম পরিচালনার জন্য মানবপাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাচারকারীরা সাধারণত তথ্যপ্রযুক্তি, কল সেন্টার, বিপণনসহ বিভিন্ন খাতে বৈধ চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করে। পরে তাদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে থাকা স্ক্যাম কম্পাউন্ডে নিয়ে গিয়ে অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হয়। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে অনলাইন সম্পর্কের মাধ্যমে প্রতারণা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি বা বিনিয়োগের নামে প্রতারণার মতো কার্যক্রম রয়েছে।
পাচারের শিকার ব্যক্তিদের অনেকেই নিজেরাও প্রতারণার শিকার হন। আবার কেউ কেউ জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণায় যুক্ত থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে সরাসরি অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। এ কারণে ভুক্তভোগীদের যথাযথভাবে শনাক্ত করা এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ইউএনওডিসি ও ইইউ।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের ভেতরেও ছোট পরিসরে সাইবার স্ক্যাম পরিচালনার কেন্দ্র গড়ে ওঠার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের মানবপাচারের শিকার হিসেবে নিয়মিত ও কার্যকরভাবে শনাক্ত বা স্ক্রিনিং করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আইনগত কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে পাস হওয়া নতুন মানবপাচার আইনে ‘ফোর্সড ক্রিমিনালিটি’ বা জোরপূর্বক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করাকে মানবপাচারের শোষণের ধরন হিসেবে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পাঁচটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে বিষয়টি আইনে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তদন্ত ও আন্তঃদেশীয় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব
সাইবার স্ক্যামভিত্তিক মানবপাচার মোকাবিলায় ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ ও সুরক্ষার পাশাপাশি তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ, সাইবার অপরাধ তদন্ত এবং অবৈধ অর্থের প্রবাহ অনুসন্ধানে সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মানবপাচার ও সাইবার স্ক্যামের সঙ্গে যুক্ত অপরাধী চক্র শনাক্ত এবং তাদের কার্যক্রম বন্ধ করার পাশাপাশি পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
৯০ লাখ ইউরোর প্রকল্প
ইইউ জানিয়েছে, প্রতিবেদনটি ৯০ লাখ ইউরো অর্থায়নে পরিচালিত আঞ্চলিক প্রকল্প ‘প্রিভেন্টিং অ্যান্ড অ্যাড্রেসিং ট্রাফিকিং ইন হিউম্যান বিইংস অ্যান্ড স্মাগলিং অব মাইগ্র্যান্টস ইন সাউথ এশিয়া (টিএইচবি-এসওএম)’-এর আওতায় তৈরি হয়েছে। প্রকল্পটি ইউএনওডিসি বাস্তবায়ন করছে।
ইইউর বাংলাদেশ মিশন এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছে, অভিবাসন হতে হবে নিয়মিত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ। শোষণের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা দিতে হবে এবং মানবপাচার প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধী চক্র ভেঙে দিতে কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে।
ইইউ ও ইউএনওডিসি জানিয়েছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করে মানবপাচার প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং জবাবদিহি জোরদারে তারা কাজ করছে। নতুন প্রতিবেদনের মাধ্যমে ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ ও সুরক্ষা, শক্তিশালী তদন্ত এবং আন্তঃদেশীয় সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।





