জুয়া খেলেই সর্বনাশ ৩ লাখ ৬০ হাজার বাংলাদেশির

মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, জন্মতারিখ, কেওয়াইসি ও লেনদেনের তথ্য থাকার দাবি; নমুনা যাচাইয়ে মিলেছে প্রকৃত তথ্য

টুইট ডেস্ক: অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো ব্যবহারকারী প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার বাংলাদেশির ব্যক্তিগত তথ্য ডার্ক ওয়েবে বিক্রির জন্য প্রকাশ করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সাইবার অপরাধীদের একটি চক্রের দেওয়া বিজ্ঞাপনে এসব তথ্যের মধ্যে নাম, মুঠোফোন নম্বর, ই-মেইল, জন্মতারিখ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব, পরিচয় যাচাইয়ের অবস্থা, সর্বশেষ অর্থ জমা ও ঝুঁকি-সংক্রান্ত তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছে।

ডার্ক ওয়েবে ‘নেফেক্স৭৮’ নামে এবং টেলিগ্রামভিত্তিক ‘নেফেক্স দ্য ব্ল্যাকহ্যাট’ নামে একটি চ্যানেলে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তথ্যগুলো ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের বাংলাদেশি অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো ব্যবহারকারীদের। একই তথ্যভান্ডার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টেও প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার ব্যবহারকারীর তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপনে থাকা তথ্যের বিবরণ অনুযায়ী, ব্যবহারকারীর পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্যের পাশাপাশি খেলোয়াড় পরিচিতি, ব্যবহারকারীর নাম, বিশেষ সুবিধার স্তর, পরিচিতি নম্বর, নিবন্ধন-সংক্রান্ত তথ্য, মুঠোফোন নম্বর, ই-মেইল, জন্মতারিখ এবং আঙুলের ছাপসংক্রান্ত তথ্যও থাকার দাবি করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সর্বশেষ অর্থ জমা, পরিচয় যাচাইয়ের অবস্থা, যাচাই-সংক্রান্ত মন্তব্য এবং ঝুঁকির তথ্যও ওই তথ্যভান্ডারে থাকার কথা বলা হয়েছে।

পুরো তথ্যভান্ডার বিক্রির জন্য ৭৮০ মার্কিন ডলার দাম চাওয়া হয়েছে। অর্থ পরিশোধে বিটকয়েন অথবা মনেরো ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা দেখাতে কয়েকটি নমুনা নথিও প্রকাশ করেছে অপরাধী চক্রটি।

অনুসন্ধানে প্রকাশিত নমুনা নথিতে থাকা একাধিক বাংলাদেশির ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাবের তথ্য যাচাই করে প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে। ফলে বিষয়টি কেবল ডার্ক ওয়েবে দেওয়া কোনো ভুয়া তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন নয়—নমুনা তথ্যের অন্তত একটি অংশ বাস্তব হওয়ার প্রমাণ মিলেছে।

ফাঁসের উৎস নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এসব তথ্য কোনো জুয়া খেলার মুঠোফোনভিত্তিক কার্যক্রম থেকে বেহাত হয়েছে কি না, নাকি কোনো এজেন্ট, সহযোগী প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো তথ্য সংরক্ষণব্যবস্থা থেকে তা অপরাধীদের হাতে গেছে—তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মুঠোফোন নম্বর, ই-মেইল, জন্মতারিখ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের সঙ্গে পরিচয় যাচাই এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য অপরাধীদের হাতে গেলে লক্ষ্যভিত্তিক প্রতারণা, পরিচয় চুরি, হিসাব দখল ও আর্থিক জালিয়াতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। এমনকি ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় বা সামাজিকভাবে হেয় করার ঘটনাও ঘটতে পারে।

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা জানিয়েছেন, তিনি নমুনা তথ্য যাচাই করে বাস্তব তথ্যের সঙ্গে মিল পেয়েছেন। তার মতে, এ কারণে বিষয়টিকে আর শুধু ডার্ক ওয়েবে প্রকাশিত দাবি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি গুরুতর তথ্য ফাঁসের ঘটনা হতে পারে।

তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, যারা অনলাইন জুয়া বা সন্দেহজনক কোনো মুঠোফোনভিত্তিক কার্যক্রমে মুঠোফোন নম্বর, ই-মেইল, পরিচয়পত্র বা আর্থিক তথ্য দিয়েছেন, তারা দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হিসাবের গোপন সংকেত পরিবর্তন করবেন। প্রতিটি হিসাবে আলাদা গোপন সংকেত ব্যবহার এবং দুই স্তরের নিরাপত্তা চালু রাখার পাশাপাশি ব্যাংক ও মুঠোফোনভিত্তিক আর্থিক সেবার লেনদেন নিয়মিত যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া অপরিচিত ফোন, সন্দেহজনক সংযোগ, মুঠোফোনের কার্যক্রম, লোভনীয় প্রস্তাব কিংবা ভয় দেখিয়ে অর্থ চাওয়ার ঘটনায় সাড়া না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। প্রতারণা বা ভয় দেখানোর ঘটনা ঘটলে অর্থ না দিয়ে ফোন নম্বর, সংযোগ, পর্দার ছবি ও লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সহায়তা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এদিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ও বিশেষ অপরাধ বিভাগ এবং র‍্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে আগে কোনো তথ্য পাওয়ার কথা জানায়নি। তবে গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। র‍্যাবও জানিয়েছে, তাদের সাইবার দল এ ধরনের বিষয় নিয়ে নিয়মিত কাজ করে এবং প্রয়োজন হলে তদন্ত করা হয়।