যুক্তরাষ্ট্রে ২ হাজারের বেশি ‘সন্ত্রাসী’ গ্রেপ্তার-বহিষ্কার: ওয়াল্টজের দাবি

/১১-এর ২৫ বছর পূর্তির আগে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তা নীতির চিত্র তুলে ধরলেন জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক প্রশাসনের সময়ে প্রবেশ করা ২ হাজারের বেশি পরিচিত বা সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের দাবি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সময়ে বিদেশে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযান এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি থাকা মার্কিন নাগরিকদের উদ্ধারের কথাও তুলে ধরেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ।

৯/১১-এর ভয়াবহ হামলার ২৫ বছর পূর্তির প্রাক্কালে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা—আইসিই—২ হাজার ১৫০-এর বেশি ‘পরিচিত বা সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী’কে গ্রেপ্তার করেছে। একই সময়ে ২ হাজার ১৫ জনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

ওয়াল্টজের বক্তব্যে এই পরিসংখ্যানকে ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ওই কৌশলের মূল অগ্রাধিকার হিসেবে সীমান্ত নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অধিক ক্ষমতা দেওয়া, সামরিক সক্ষমতার ব্যবহার এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিদেশে হাজারের বেশি সন্ত্রাসী নিহতের দাবি

প্রশাসনের কর্মকর্তারা আরও দাবি করেছেন, ২০২৫ সালের শুরু থেকে বিদেশে পরিচালিত বিভিন্ন সামরিক অভিযান ও বিমান হামলায় ১ হাজারের বেশি জিহাদি বা সন্ত্রাসী সদস্য নিহত হয়েছে।

এসব অভিযানের আওতায় আইএস, আল-কায়েদার সহযোগী সংগঠন, আল-শাবাবসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। সোমালিয়াসহ আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অভিযান এর মধ্যে রয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে নিহত ব্যক্তির মোট সংখ্যা নিয়ে প্রশাসনের ব্যবহৃত সমষ্টিগত হিসাব এবং স্বাধীন গবেষণা বা পৃথক সামরিক অভিযানের হিসাব সব সময় এক নয়। ফলে ১ হাজারের বেশি নিহতের সংখ্যাটিকে মার্কিন প্রশাসনের দাবি হিসেবে উপস্থাপন করাই সাংবাদিকতার দিক থেকে অধিক নিরাপদ।

জিম্মিদশা থেকে ১১০-এর বেশি মার্কিন নাগরিক মুক্তির দাবি

ওয়াল্টজ আরও বলেন, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি থাকা ১১০-এর বেশি মার্কিন নাগরিককে মুক্ত করা হয়েছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা কোনো একক অভিযান বা সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছ থেকে মার্কিন নাগরিকদের মুক্তি বা উদ্ধারের সম্মিলিত হিসাব।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ একাধিক জিম্মি সংকটে মার্কিন কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতার পাশাপাশি সামরিক সক্ষমতাকে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছে ওয়াশিংটন। এ প্রসঙ্গে ওয়াল্টজ এর আগেও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিলেও প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বজায় রেখেছে।

প্রথম সপ্তাহের নীতিকেই সামনে আনছেন ওয়াল্টজ

ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে সীমান্ত নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে নেওয়া হয়। ওয়াল্টজ তার বক্তব্যে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সপ্তাহের সেই নীতিগত অবস্থানের কথা স্মরণ করেন।

তার বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল—আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সামরিক বাহিনী, আইসিই ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করা। ওয়াল্টজ বর্তমানে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

‘সন্ত্রাসী’ পরিচয়ের সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন

তবে প্রশাসনের পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। বিশেষ করে ‘পরিচিত বা সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী’—এই শ্রেণিবিন্যাসের আওতায় কাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট অপরাধের প্রমাণ কী এবং কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে টেকসই হয়েছে—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।

এ ছাড়া বিদেশে পরিচালিত কিছু মার্কিন সামরিক অভিযান, বিশেষ করে নৌযান বা কথিত ‘নার্কো-সন্ত্রাসী’দের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অভিযান, নিয়েও আইনগত ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রশ্ন উঠেছে। ফলে ওয়াল্টজের বক্তব্যকে শুধু সংখ্যার হিসাব হিসেবে না দেখে ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী নীতির রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ওয়াল্টজের বক্তব্যের তাৎপর্য মূলত তিনটি জায়গায়—অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় ব্যাপক অভিবাসন enforcement, বিদেশে সন্ত্রাসবিরোধী সামরিক অভিযান এবং জিম্মি উদ্ধারে কূটনীতি ও সামরিক শক্তির সমন্বয়। তবে এসব সাফল্যের পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে প্রশাসনের নিজস্ব সংজ্ঞা ও স্বাধীন যাচাইয়ের মধ্যে পার্থক্য থাকায় প্রতিটি সংখ্যা পৃথকভাবে যাচাই করে প্রকাশ করাই অধিক নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকতা।

সূত্র: মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ (DHS), ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE), জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজের বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।