রাজশাহীতে বিপৎসীমার ৭৯ সেন্টিমিটার নিচে পদ্মার পানি, প্লাবিত চরাঞ্চল

উজানের ঢলে বাড়ছে পানি, ঘরবাড়ি ছাড়ছেন অনেকেই; শহর রক্ষা বাঁধে এখনো ঝুঁকি নেই—পাউবো।
রাজশাহী প্রতিনিধি: উজানের ঢলে রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। ইতোমধ্যে দক্ষিণ তীরের বিভিন্ন চর ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে; অনেক পরিবার গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছে।
রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানির বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। ১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকাল ৯টায় পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ২০ মিটার, অর্থাৎ বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচে। পরে একই দিন সন্ধ্যা ৬টায় পানির উচ্চতা বেড়ে ১৭ দশমিক ২৬ মিটারে পৌঁছে যায়। ফলে সন্ধ্যায় বিপৎসীমার চেয়ে পানি ছিল ৭৯ সেন্টিমিটার নিচে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিন ধরে পদ্মায় ধারাবাহিকভাবে পানি বাড়ছে। ১০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় রাজশাহী পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ০৫ মিটার। তিন ঘণ্টা পর তা বেড়ে ১৭ দশমিক ১২ মিটার এবং সন্ধ্যা ৬টায় ১৭ দশমিক ১৫ মিটারে দাঁড়ায়। পরদিন সকাল ৯টায় তা আরও বেড়ে ১৭ দশমিক ২০ মিটার হয়।
প্লাবিত চরখিদিরপুর-খানপুরসহ নিম্নাঞ্চল
পদ্মার পানি বাড়ায় রাজশাহী শহরের দক্ষিণে অবস্থিত চরখিদিরপুর, খানপুর, মাঝচর, আষাড়িয়াদহ, খিদিরপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বসতবাড়িতেও পানি প্রবেশ করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ গবাদিপশু নিয়ে শহর রক্ষা বাঁধের দিকে কিংবা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন।
চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি কৃষিজমি, গবাদিপশু, যোগাযোগব্যবস্থা ও নিরাপদ খাবার পানির ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে অনেক পরিবার এরই মধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
শহর রক্ষা বাঁধ নিয়ে আপাতত শঙ্কা নেই
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর জানিয়েছেন, পদ্মার পানি বাড়লেও রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধ নিয়ে এখনো কোনো ঝুঁকি তৈরি হয়নি। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পানি উন্নয়ন বোর্ড সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বাঁধের কোথাও ঝুঁকির সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নথিতেও রাজশাহী পয়েন্টকে গঙ্গা-পদ্মা নদীর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। রাজশাহী স্টেশনের বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার হিসেবে পুরোনো পানি-তথ্য নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
উজানের পানি ও ফারাক্কার প্রভাব
পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, উজানের ঢলের কারণে প্রায় ১০ দিন ধরে পদ্মায় পানি বাড়ছে। একই সময়ে ফারাক্কা ব্যারাজের উজানেও গঙ্গার পানি বৃদ্ধির খবর পাওয়া গেছে। ১০ সেপ্টেম্বরের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ফারাক্কা ব্যারাজের ১০৯টি গেট খোলা থাকার এবং অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়। তবে ফারাক্কার গেট খোলার সঙ্গে রাজশাহীতে ঠিক কত পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয়েছে—এ বিষয়ে সরকারি সূত্রের সরাসরি পরিমাপ ছাড়া নির্দিষ্ট পরিমাণকে চূড়ান্ত তথ্য হিসেবে ধরা ঠিক হবে না।
আরও বাড়তে পারে পানি, তবে বিপৎসীমার নিচে থাকার পূর্বাভাস
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন সরকারি পূর্বাভাস ব্যবস্থা। কেন্দ্রটি নদীর পানি পর্যবেক্ষণ, তাৎক্ষণিক পানি-স্তর এবং স্বল্পমেয়াদি পূর্বাভাস প্রদান করে।
১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টার দিকে রাজশাহী পয়েন্টে পানির উচ্চতা ১৭ দশমিক ১৯ মিটার ছিল। পরবর্তী পূর্বাভাসে ১২ সেপ্টেম্বর পানির উচ্চতা প্রায় ১৭ দশমিক ২৩ মিটার হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টার পর্যবেক্ষণে পানি ইতোমধ্যে ১৭ দশমিক ২৬ মিটারে পৌঁছেছে। ফলে পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তব পর্যবেক্ষণের পার্থক্যও নজরে রাখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষণের দিক থেকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পানি বৃদ্ধির গতি। ১৮ দশমিক ০৫ মিটার বিপৎসীমার নিচে থাকলেও দ্রুত পানি বাড়তে থাকলে চর ও নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে নতুন করে পানি ঢোকার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
চরবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান
পদ্মার পানি আরও বাড়লে চরাঞ্চলের বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও গবাদিপশুর ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্দেশনা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী রাজশাহী শহর এখনো সরাসরি বন্যার ঝুঁকিতে নেই এবং শহর রক্ষা বাঁধও নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়মিত পানি-স্তর পর্যবেক্ষণ এবং চরাঞ্চলে নজরদারি জোরদার রাখতে হবে।
সূত্র: বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি), রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ড








