জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ১০ জাহাজে আঘাতের দাবি

ছবি: রয়টার্স

পাঁচ ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ধ্বংসের পর পাল্টা হামলা; জর্ডানের দাবি, ২০ ক্ষেপণাস্ত্রের ১৮টি ভূপাতিত, হতাহতের খবর নেই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ধ্বংসের ঘোষণার পর পাল্টা জবাব দিয়েছে ইরান। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) দাবি, ৯ সেপ্টেম্বর জর্ডানের আল-আজরাক এলাকায় মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত একটি সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ১০টি জাহাজে হামলা চালানোর দাবিও করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড।

রয়টার্সের ভাষ্য, গত ছয় মাস ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে সাম্প্রতিক এই ঘটনা নতুন করে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি করেছে।

আইআরজিসির বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাঙ্কার ধ্বংস করার পরই এই পাল্টা অভিযান চালানো হয়। ইরানি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে তারা মার্কিন সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। ইরানি পক্ষ আরও দাবি করেছে, হামলায় যুদ্ধবিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের স্থাপনা, প্রস্তুতি কেন্দ্র এবং যুদ্ধবিমানের আশ্রয়স্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে ইরানের এসব দাবির বিপরীতে জর্ডান ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি জর্ডানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় পড়েছে। হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলেও জানিয়েছে জর্ডান। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ ও ছড়িয়ে পড়া অংশ নিরাপদে সরিয়ে নিতে বিশেষজ্ঞ দল কাজ শুরু করেছে।

১০ জাহাজে হামলার দাবি

জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ১০টি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি। ইরানি বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে দুটি মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ এবং আটটি তেলবাহী জাহাজ ছিল। এসব জাহাজকে হরমুজ প্রণালির একটি ‘নিষিদ্ধ ও অনিরাপদ’ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করার সময় লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।

ইরানি পক্ষ আরও দাবি করেছে, দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করা হয়েছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

এদিকে ইরান কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরে অবস্থানরত তেলবাহী জাহাজগুলোর জন্যও হুঁশিয়ারি দিয়েছে। আইআরজিসি জাহাজগুলোর ক্রুদের দ্রুত জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং সতর্ক করেছে যে এসব জাহাজও হামলার লক্ষ্য হতে পারে।

পাঁচ ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ধ্বংস যুক্তরাষ্ট্রের

এই পাল্টাপাল্টি হামলার সূত্রপাত হয় যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার পর। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইরানের পাঁচটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে।

মার্কিন বাহিনীর দাবি, আগের দুই দিনে ইরানের আইআরজিসি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একটি মার্কিন নৌযানকে দুবার লক্ষ্যবস্তু করার পর ওই হামলা চালানো হয়। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হামলার আগে জাহাজগুলোর ক্রুদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং পরে জাহাজগুলোকে অচল করে দেওয়া হয়। কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি বলেও জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরান যতবার মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে হামলার চেষ্টা করবে, ততবার ইরানকে তেলবাহী জাহাজ হারানোর ঝুঁকি নিতে হবে। তাঁর এই বক্তব্য থেকে ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।

জর্ডান কেন গুরুত্বপূর্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমের জন্য জর্ডান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। দেশটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন সামরিক অভিযানে জর্ডানের ভূখণ্ড ও ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করা হয়। ফলে ইরানের পক্ষ থেকে জর্ডানে মার্কিন স্থাপনায় হামলা সংঘাতকে সরাসরি আরও একটি আঞ্চলিক রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে টেনে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আলি আবদোল্লাহিও আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আঘাত করা হবে। এরপরই ইরানের পক্ষ থেকে জর্ডানের ঘাঁটিতে হামলার দাবি সামনে আসে।

হরমুজ ঘিরে বাড়ছে ঝুঁকি

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে হরমুজ প্রণালিতে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে।

১০টি জাহাজে হামলার ইরানি দাবি এবং কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরে থাকা তেলবাহী জাহাজগুলোকে দেওয়া হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, তেল সরবরাহ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তেলের বাজারেও প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে পড়েছে। ইরানি তেলবাহী জাহাজে মার্কিন হামলা, জর্ডানে ইরানের পাল্টা হামলা এবং সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হুথিদের হামলার কারণে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি উঠে যায়।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়েও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা, হরমুজে জাহাজে হামলার দাবি এবং সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ইরান-সমর্থিত হুথিদের আক্রমণ—সব মিলিয়ে সংঘাতের পরিধি দ্রুত বাড়ছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় এক মাসের তুলনামূলক শান্ত অবস্থার পর সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়েছে। সামরিক, নৌ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্রদেরও সংঘাতে টেনে আনা হচ্ছে।

ফলে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং হরমুজে ১০টি জাহাজে আক্রমণের দাবি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে।