হরমুজে মার্কিন চালকবিহীন সাবমেরিন আটক করল ইরান, দাবি আইআরজিসির

আইআরজিসির দাবি, আধুনিক প্রযুক্তির ডুবোযানটি আটক করা হয়েছে; পেন্টাগনের ভাষ্য, ত্রুটির কারণে এক দিন আগেই অচল হয়েছিল ড্রোনটি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে একটি মার্কিন চালকবিহীন সাবমেরিন ড্রোন আটক করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এ দাবি প্রকাশ করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ড্রোনটি এক দিনেরও বেশি সময় আগে ত্রুটির কারণে অচল হয়ে পড়েছিল এবং এতে কোনো সংবেদনশীল তথ্য বা শ্রেণিবদ্ধ সরঞ্জাম ছিল না।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে একটি ‘অত্যাধুনিক ও বুদ্ধিমান’ মার্কিন চালকবিহীন সাবমেরিন আটক করা হয়েছে। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, গোয়েন্দা ও অভিযান পরিচালনার জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ডুবোযানটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে।
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আটক ডুবোযানটি ডাইভ-এলডি মডেলের একটি বড় স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যান্ডুরিল তৈরি করেছে। প্রায় ১৯ ফুট বা ৫ দশমিক ৮ মিটার দীর্ঘ এই ডুবোযান সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি, সমুদ্রপথে মাইন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয়করণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সমুদ্রের নিচের তার ও পাইপলাইনের মতো অবকাঠামো পরিদর্শনে ব্যবহার করা যায়।
তবে ইরানের দাবির জবাবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তন জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট ডুবোযানটি এক দিনেরও বেশি সময় আগে ত্রুটির কারণে অচল হয়ে পড়ে। এটি আঞ্চলিক জলসীমায় চলমান সামরিক অভিযানের সহায়তায় নজরদারি চালাচ্ছিল।
পেন্টাগনের এক মুখপাত্র বলেন, ড্রোনটি পুরোনো মডেলের এবং ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এতে কোনো সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা ছিল না এবং শ্রেণিবদ্ধ সোনার বা রাডার সরঞ্জামও ছিল না। ফলে ড্রোনটি ইরানের হাতে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক তথ্য ফাঁসের আশঙ্কা নেই বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ড্রোনটির নির্মাতা অ্যান্ডুরিলও একটি ডুবোযান হারানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডাইভ-এলডি এমন একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, যা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে ব্যবহারের জন্য তৈরি এবং প্রয়োজনে যানটি হারানোর ঝুঁকিও এর নকশার অংশ হিসেবে বিবেচিত।
অ্যান্ডুরিলের তথ্য অনুযায়ী, ডাইভ-এলডি ঘাঁটিতে ফিরে না গিয়ে সর্বোচ্চ ১০ দিন পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হতে পারে এবং প্রায় ৬ হাজার মিটার গভীরতায় ডুব দিতে সক্ষম। ২০২৪ সালে প্রকাশিত মার্কিন সামরিকবিষয়ক একটি প্রতিবেদনে প্রতিটি ডাইভ-এলডির আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৫ লাখ ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
হরমুজে বাড়ছে উত্তেজনা
মার্কিন ডুবোযান আটকের এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করেছে বলে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে। এর জবাবে ইরান জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনেও। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার মাত্র ছয়টি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে, যেখানে আগের দিনের সংখ্যা ছিল নয়টি এবং গত ১০ দিনের গড় ছিল প্রায় ১২টি।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে তেল সরবরাহ ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে এবং বুধবার সকালে ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
মার্কিন ডুবোযান আটকের ঘটনাটি তাই সামরিক দিক থেকে সীমিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এর প্রতীকী ও কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে চালকবিহীন সামরিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও নজরদারি নিয়ে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সূত্র: রয়টার্স





