সৌদিতে হুথিদের হামলার পর হরমুজে জাহাজ চলাচলে ধস, তেলের বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ

সৌদির চার শহরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আহত ৭৩; জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ধ্বংস পাঁচ ইরানি তেলবাহী জাহাজ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের উত্তেজনা ছড়িয়েছে। মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক শহর ও তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ ৭৩ জন আহত হয়েছেন। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী পাঁচটি ইরানি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে। এর পর ইরান জর্ডানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে।

হুথিদের হামলার লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের আভা, খামিস মুশাইত, নজরান ও জাজান শহর। হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, তাদের বাহিনী বিস্তৃত অভিযান চালিয়ে এসব এলাকায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। খামিস মুশাইতের একটি সৌদি বিমানঘাঁটি এবং আভা, নজরান ও জাজানে সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনাগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল।

হামলার পর সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। নাসার উপগ্রহচিত্রে জাজান শোধনাগারের ওপর ঘন কালো ধোঁয়া এবং আভায় একটি তেল বিতরণকেন্দ্র থেকে সাদা ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন ধরে যায় এবং মোট ৭৩ জন আহত হন।

সৌদি কর্তৃপক্ষ হামলাকে গুরুতর উসকানি হিসেবে দেখছে। দেশটির নেতৃত্বাধীন জোট হুথিদের বিরুদ্ধে কঠোর জবাব দেওয়ার কথা জানিয়েছে। হুথিদের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক তৎপরতার জবাব হিসেবেই তারা এসব হামলা চালিয়েছে।

পাঁচ ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংসের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের

সৌদি আরবে হুথিদের হামলার সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা মঙ্গলবার পাঁচটি ইরানি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, এসব জাহাজ ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়নে ব্যবহৃত একটি গোপন তেল পরিবহন নেটওয়ার্কের অংশ ছিল।

মার্কিন কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, এর আগে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী পরপর দুই দিন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একটি মার্কিন নৌযানকে লক্ষ্য করেছিল। সেই হামলার প্রতিক্রিয়াতেই তেলবাহী জাহাজগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে বলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়। মার্কিন দাবি অনুযায়ী, এসব হামলায় কোনো মার্কিন নাগরিক হতাহত হননি।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইরান যতবার মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে হামলার চেষ্টা করবে, ততবার তাদের তেলবাহী জাহাজ হারানোর ঝুঁকি থাকবে। এতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি ইরানের জ্বালানি রপ্তানির ওপর চাপ আরও বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

তেলবাহী জাহাজ ধ্বংসের পর ইরানও পাল্টা আঘাত হানে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিবৃতি অনুযায়ী, জর্ডানের আল-আজরাক এলাকার কাছে একটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।

ইরান দাবি করেছে, হামলায় মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে জর্ডান জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া ২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে। বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে এবং এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

ইরান এর আগেও যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। জর্ডানও এর আগে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে। গত জুলাইয়ের একটি হামলায় দুই মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

দুই মার্কিন যুদ্ধজাহাজেও হামলার দাবি

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আরও দাবি করেছে, তারা দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করেও হামলা চালিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এ তথ্য প্রচার করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এ দাবির বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

এদিকে ইরান কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরে থাকা তেলবাহী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করার হুমকিও দিয়েছে। পৃথকভাবে একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে জাহাজটির ক্ষতির জন্য কে দায়ী, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সৌদি হামলায় নতুন মাত্রা পেল যুদ্ধ

ইরান-সমর্থিত হুথিদের সৌদি আরবের গভীরে হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ছয় মাসের সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে সৌদির তেল অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় এর প্রভাব শুধু সামরিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

সৌদি আরব এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা আরব জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেনে সংঘাত অনেকটা কমে এলেও চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে। হুথিরা এর আগে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্র অবরোধের হুমকি দিয়েছিল এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব এলাকায় জাহাজ চলাচলে চাপ সৃষ্টি করেছে।

তেলের বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ

সৌদি তেল স্থাপনায় হামলা, ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস এবং জর্ডানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৯৮ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দাম আরও বেড়ে প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি চলে যায়। রয়টার্সের হিসাবে, ব্রেন্টের দাম একপর্যায়ে ৯৯.৩৭ ডলার পর্যন্ত উঠেছে।

হরমুজ প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল কমেছে। মঙ্গলবার মাত্র ছয়টি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে, যেখানে আগের দিন ছিল নয়টি এবং গত ১০ দিনের গড় ছিল ১২টি। গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহনপথে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে ৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইরানি তেলবাহী জাহাজে মার্কিন হামলার পর সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হুথিদের আঘাত এবং জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলা দেখাচ্ছে, আঞ্চলিক সংঘাত এখন একাধিক দেশ ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।