রাজশাহীতে প্রাণী রক্ষায় শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, বিএএভির পাশে আরডিএ চেয়ারম্যান

৩০ সেপ্টেম্বর আরডিএ পার্কে অনুষ্ঠান; তরুণদের নেতৃত্বে প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণে স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক গড়ার প্রত্যাশা।
রাজশাহী প্রতিনিধি: প্রাণী ও প্রকৃতি রক্ষায় শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগকে আরও গতিশীল করতে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইটকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যানিমেল অ্যালাইজ ভলান্টিয়ার্স (BAAV)। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর আরডিএ পার্কে সংগঠনটির একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা।
রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে দেওয়া আমন্ত্রণপত্রে বিএএভির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও চলমান বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, মানুষ ও প্রকৃতির পাশাপাশি যেসব প্রাণী নিজেদের প্রয়োজন বা সংকটের কথা মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারে না, তাদের সুরক্ষা, কল্যাণ এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাই সংগঠনটির অন্যতম লক্ষ্য।
বিএএভির একটি অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। পথের পাখি, কুকুর-বিড়াল, দেশীয় বন্যপ্রাণীসহ বিভিন্ন প্রাণীর জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবকেরা কাজ করছেন। বিপদগ্রস্ত প্রাণী উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা, খাবার ও পানির সুযোগ তৈরি এবং প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকৃতি সংরক্ষণেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংগঠনটির কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা, বিপদগ্রস্ত প্রাণী উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসা, বৃক্ষরোপণ, সবুজায়ন এবং প্রাণীবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা। নগরায়ণের ফলে প্রাণীদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, গাছপালা কমে যাওয়া এবং খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
শুধু একটি সংগঠনের কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ এবং সমমনা পরিবেশবাদী সংগঠনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পরিকল্পনাও রয়েছে বিএএভির। শিক্ষার্থীদের মতে, তরুণ প্রজন্মকে প্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে আরও মানবিক, দায়িত্বশীল ও পরিবেশবান্ধব সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
চেয়ারম্যানকে বিস্তারিত জানালেন বিএএভির-এর প্রধান নির্বাহী হামীম
আমন্ত্রণকালে বাংলাদেশ অ্যানিমেল অ্যালাইজ ভলান্টিয়ার্সের (BAAV) প্রধান নির্বাহী ও পরিচালক গোলাম মুহীউদ্দীন হামীম সংগঠনটির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আরডিএ চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইটকে বিস্তারিত অবহিত করেন।
হামীম জানান, প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করাই BAAV-এর অন্যতম উদ্দেশ্য। নগরায়ণ ও পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে অনেক প্রাণী তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল হারাচ্ছে। পথ-পাখি, কুকুর-বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণী খাবার, পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিপদগ্রস্ত প্রাণীর দ্রুত উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে BAAV-এর স্বেচ্ছাসেবকেরা বিপদগ্রস্ত প্রাণী উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি প্রাণীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছেন বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, প্রাণী উদ্ধার বা চিকিৎসার মধ্যেই BAAV-এর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ নয়। বৃক্ষরোপণ, সবুজায়ন, প্রাণীদের খাবার ও পানির ব্যবস্থা, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রকৃতিবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গোলাম মুহীউদ্দীন হামীম আরডিএ চেয়ারম্যানকে বলেন, রাজশাহীর নগর পরিকল্পনায় সবুজ এলাকা, পার্ক, জলাধার এবং প্রাণীবান্ধব পরিবেশের বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পেলে মানুষ ও প্রাণী—উভয়ের জন্যই ভারসাম্যপূর্ণ নগর পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে আরডিএর সহযোগিতা, পরামর্শ ও সমন্বয় BAAV-এর কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর আরডিএ পার্কে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য কার্যক্রম সম্পর্কেও চেয়ারম্যানকে অবহিত করেন এবং অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি ও সহযোগিতা কামনা করেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্যোগের প্রশংসা চেয়ারম্যানের
শিক্ষার্থীদের এমন উদ্যোগের প্রশংসা করে আরডিএ চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “নিঃসন্দেহে তোমাদের এই উদ্যোগ খুবই ভালো। তোমাদের অনুষ্ঠান সফল করার জন্য আমি সর্বাত্মক সাহায্য করব। তবে এসব কর্মকাণ্ডের জন্য যেন পড়াশোনার ক্ষতি না হয়।”
চেয়ারম্যানের বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও পরিবেশগত কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনার সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
এদিকে, রাজশাহীকে পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় সবুজ এলাকা, পার্ক, জলাধার ও প্রাকৃতিক পরিবেশের পাশাপাশি প্রাণীদের নিরাপদ আবাস ও চলাচলের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হলে নগরবাসীর জীবনমানের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও সুরক্ষিত হতে পারে।
আরডিএ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আবুল কালাম আজাদ সুইট নগরবাসীর স্বস্তিদায়ক জীবনযাপন, নাগরিক সুবিধা এবং পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের দিন আরডিএ কার্যালয় প্রাঙ্গণে তিনি একটি গাছের চারাও রোপণ করেন।
২০২৬ সালের জুনে সরকার আবুল কালাম আজাদ সুইটকে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। পরে ১৫ জুন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তরুণদের নেতৃত্বে প্রাণীকল্যাণের স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্কের লক্ষ্য
BAAV-এর প্রধান নির্বাহী ও পরিচালক গোলাম মুহীউদ্দীন হামীম বলেন, তরুণদের নেতৃত্বে প্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণে একটি কার্যকর স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চায় BAAV। এ জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং প্রাণী ও পরিবেশকল্যাণে আগ্রহী নাগরিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “For the voiceless. For the vulnerable. For every life”— এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে তারা কাজ করছেন। প্রাণীরা মানুষের মতো নিজেদের কথা বলতে পারে না; তাই তাদের নিরাপদে বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরি করা মানুষের দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে যদি প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ তৈরি করা যায়, সেটিই তাদের বড় অর্জন।
শিক্ষার্থীরা জানান, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর আরডিএ পার্কে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ বাড়ানো, তরুণদের স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং আরও শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিককে এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করার প্রত্যাশা রয়েছে।
BAAV-এর ভাষায়, “For the voiceless. For the vulnerable. For every life”—এই অঙ্গীকার শুধু একটি সংগঠনের স্লোগান নয়; বরং কথা বলতে না পারা প্রাণী, ঝুঁকিতে থাকা জীববৈচিত্র্য এবং প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়িত্বশীলতার একটি বার্তা।








