স্পট মার্কেটনির্ভর এলএনজি, বাড়ছে সরকারের ব্যয়

কাতারের সরবরাহ অনিশ্চিত; দুই কার্গোতেই অতিরিক্ত ব্যয় ১২৩ কোটি টাকা, আগস্টে ভর্তুকি ৪ হাজার ৭৫০ কোটি
টুইট ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় স্পট মার্কেটের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বাড়ছে। এতে গ্যাসের আমদানি ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি সরকারের ভর্তুকির চাপও তীব্র হচ্ছে।
চলমান সংকট মোকাবিলায় সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের জন্য চার কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে তিনটি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে এবং একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় কেনা হবে। এসব এলএনজি কিনতে ব্যয় হবে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির অন্যতম প্রধান উৎস কাতার। ওমানের সঙ্গেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে তুলনামূলক স্থিতিশীল দামে গ্যাস পাওয়া গেলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সেই সরবরাহ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মধ্যে এলএনজি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর কাতার সরবরাহ সীমিত করে। জুলাইয়ে একটি কার্গো এলেও নিয়মিত সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। সর্বশেষ নভেম্বর পর্যন্ত অনিবার্য পরিস্থিতির কথা জানিয়ে সরবরাহে বিলম্বের মেয়াদ বাড়িয়েছে কাতার।
এদিকে স্পট মার্কেটেও পর্যাপ্ত কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের তথ্যমতে, ৮-৯ সেপ্টেম্বর এবং ১-২ অক্টোবর সরবরাহের জন্য আহ্বান করা দুটি কার্গোর বিপরীতে কোনো প্রতিষ্ঠান এখনো প্রস্তাব দেয়নি।
দুই মাস ধরে চলা গ্যাস সংকটে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জুলাই ও আগস্টে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় সরবরাহ কমে যায়। টার্মিনাল চালু হলেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। একই সময়ে কমেছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। ৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য একটি কার্গো সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনার অনুমোদন দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এখনো সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি। এ ছাড়া দুই দফা স্পট দরপত্র আহ্বান করেও সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি। ফলে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহে রেশনিং অব্যাহত রাখতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দেশে মোট ২৩৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১৬১ কোটি ৮ লাখ ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৭১ কোটি ২ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
পুনঃদরপত্রে বাড়ল ব্যয়
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার আশায় দুটি কার্গোর আগের দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করায় সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে ১২৩ কোটি টাকার বেশি।
২৫-২৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের কার্গোর জন্য আগের দরপত্রে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ২৫ দশমিক ৬২ ডলার চেয়েছিল বিপি সিঙ্গাপুর। দর বেশি মনে হওয়ায় তা বাতিল করা হয়। পরে পুনঃদরপত্রে সর্বনিম্ন দর আসে ২৭ দশমিক ৫৪ ডলার। এতে ওই কার্গোতেই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৬৫ লাখ ডলার বা ৮০ কোটি টাকা।
একইভাবে ৫-৬ অক্টোবর সরবরাহের কার্গোর জন্য আগের দরপত্রে প্রতি ইউনিট প্রায় ২৫ দশমিক ৫ ডলার দর দিয়েছিল ভিটল এশিয়া। পুনঃদরপত্রে একই প্রতিষ্ঠান দর বাড়িয়ে ২৬ দশমিক ৬৬৮ ডলার করে। এতে ওই কার্গোতে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ৩০ লাখ ডলার বা ৩৭ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে দুটি কার্গোতেই সরকারের বাড়তি ব্যয় এক কোটি ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২৩ কোটি টাকা।
দুই সপ্তাহে দাম বেড়েছে প্রায় ৪ ডলার
সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত ২৪ আগস্ট অনুমোদিত দুই কার্গোর দাম ছিল যথাক্রমে ২৪ দশমিক ৬২ ও ২৪ দশমিক ২৫ ডলার। এর আগে ১৯ আগস্ট কেনা একটি কার্গোর দাম ছিল ২৩ দশমিক ৯৩ ডলার।
অন্যদিকে এবার স্পট মার্কেট থেকে কেনা তিনটি কার্গোর দাম পড়ছে ২৬ দশমিক ৬৭ থেকে ২৮ দশমিক ০৩ ডলারের মধ্যে। অর্থাৎ মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম সর্বোচ্চ প্রায় চার ডলার বেড়েছে।
জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি কার্গো কিনতে যেখানে ব্যয় হয়েছিল ৯৪৩ কোটি টাকার কিছু বেশি, এখন একই ধরনের কার্গো কিনতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় এক হাজার ১৩০ থেকে এক হাজার ১৮৫ কোটি টাকা।
বাড়ছে ভর্তুকির চাপ
বর্তমানে দেশে প্রতি মাসে গড়ে ১০টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়। এর মধ্যে সাত থেকে আটটি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে কিনতে হচ্ছে। প্রতিটি কার্গোর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। অথচ সেই গ্যাস বিক্রি করে সরকার আয় করছে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা।
ফলে প্রতি কার্গোতে সরকারের লোকসান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। আগস্ট মাসের এলএনজি আমদানির জন্য সরকার ইতোমধ্যে পেট্রোবাংলাকে ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সেপ্টেম্বর মাসে জাপান-কোরিয়া সূচকে এলএনজির দাম প্রতি ইউনিট ২২ দশমিক ৯৫ থেকে ২৩ দশমিক ৫০ ডলারের মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশকে ২৬ থেকে ২৮ ডলার পর্যন্ত দামে কার্গো কিনতে হচ্ছে। দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্পট মার্কেটে কিছুটা বেশি দাম স্বাভাবিক হলেও ২ থেকে ৩ ডলারের অতিরিক্ত ব্যবধান সরকারের আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বর্তমানে দেশীয় ও আমদানিকৃত গ্যাস মিলিয়ে মিশ্রিত গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট প্রায় ৪৫ টাকা। ছয় মাস আগে এ ব্যয় ছিল ৩১ টাকা ৪২ পয়সা। অথচ সরকার গ্যাস বিক্রি করছে গড়ে ২৩ টাকা ৯০ পয়সা দরে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, কাতার ও ওমানের সরবরাহ সংকট এবং স্পট মার্কেটের উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে সরকারের লোকসান আরও বাড়তে পারে। গত অর্থবছরে এ খাতে সরকারের লোকসান হয়েছিল প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির এলএনজি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, কাতারের সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার পর স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
- শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ০৩:৩৭ অপরাহ্ণ






