দীর্ঘদিনের দূষণে বিপর্যস্ত বারনই নদী, মরছে মাছ: এখনই প্রয়োজন পানি পরীক্ষা

বারনই নদীর মৎস্য অভয়াশ্রমেগু‌লো‌তে  শত শত মানুষের ভিড়, দূষণের দীর্ঘস্থায়ী সংকটে নতুন শঙ্কা।

বাগমারা (রাজশাহী) প্রতিনিধি: রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বারনই নদীর তালতলী মৎস্য অভয়াশ্রম এলাকায় বৃহস্পতিবার রাত থেকে পানিতে অস্বাভাবিকতা দেখা দেওয়ার পর মাছ মরে ভেসে ওঠার ঘটনা ঘটেছে।

আজ শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে খবরটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে নদীর দুই তীরে মাছ ধরতে শত শত মানুষের সমাগম হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হলেও তাৎক্ষণিকভাবে পানি পরীক্ষা বা দূষণের উৎস শনাক্তে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত থেকেই নদীর পানিতে গ্যাসের মতো বুদবুদ ও অস্বাভাবিকতার বিষয়টি নজরে আসে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর বিভিন্ন অংশে মাছ মরে ভেসে উঠতে দেখা যায়। শুক্রবার সকাল হলে ঘটনাটি আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিভিন্ন বয়সী মানুষ জাল, হাতজালসহ নানা উপায়ে মাছ ধরতে নদীর দুই পাড়ে ভিড় করেন।

সরেজমিনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সকাল থেকেই বারনই নদীর দুই তীরে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। কেউ পানিতে নেমে, আবার কেউ তীর থেকে জাল ফেলে মাছ সংগ্রহ করেন। মাছ মারা যাওয়ার কারণ নিশ্চিত না হলেও মরা মাছ সংগ্রহের জন্য মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিষয়টি বাগমারা উপজেলা প্রশাসনকে অ‌নেক আগেই জানানো হয়েছে। কিন্তু ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে গিয়ে পানির নমুনা সংগ্রহ, মৃত মাছ পরীক্ষা কিংবা দূষণের সম্ভাব্য উৎস শনাক্ত করার মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

তবে মাছ মারা যাওয়ার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয়দের কেউ পানিতে গ্যাস সৃষ্টির কথা বললেও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার আগে এটিকে মাছ মৃত্যুর নিশ্চিত কারণ হিসেবে বলা যাচ্ছে না।

দীর্ঘদিনের দূষণে বিপর্যস্ত বারনই

বারনই নদীতে হঠাৎ মাছ মারা যাওয়ার ঘটনাটি নতুন করে সামনে এনেছে নদীটির দীর্ঘদিনের দূষণ ও পরিবেশগত সংকটের বিষয়টি।

২০২৫ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে, রাজশাহী নগরীর তরল বর্জ্য খাল হয়ে বারনই নদীতে গিয়ে পড়ছে। পাশাপাশি নদীর দুই পাশের হাট-বাজারের বর্জ্যও নদীতে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। এসব বর্জ্যের কারণে নদীর পানি দূষিত হয়ে মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা অভিযোগ করেছেন।

একই সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, নওহাটা, বাগমারা ও তাহেরপুর এলাকার পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে বারনই নদীতে আবর্জনা পড়ছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট ডাম্পিং ব্যবস্থা না থাকায় নদী ও আশপাশের জলাশয়কে বর্জ্য ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও উঠে এসেছে।

আরও পুরোনো এক প্রতিবেদনে বারনই নদীর পানিতে রাসায়নিক ও দূষিত বর্জ্য মিশে মাছের অস্তিত্ব সংকটে পড়ার কথা উঠে আসে। নদীপাড়ের জেলে পরিবারগুলোর অনেকে মাছ না পাওয়ায় পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়।

পানিতে অক্সিজেন কমে যাওয়ার পুরোনো তথ্য
বারনই নদীর পানি নিয়ে আগের গবেষণার তথ্যও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। জাগো নিউজের এক প্রতিবেদনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, নদীর একটি নমুনায় দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা প্রতি লিটারে ১ দশমিক ২ মিলিগ্রাম পাওয়া যায়। জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনধারণের জন্য সাধারণত এর চেয়ে অনেক বেশি দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রয়োজন। ওই গবেষণায় বারনইয়ের পানিকে জৈবিকভাবে মৃত হওয়ার দিকে এগিয়ে যাওয়া হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

এর অর্থ, নদীর পানিতে দীর্ঘদিন ধরে জৈব বর্জ্য ও অন্যান্য দূষণ জমে থাকলে পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়ে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। তবে বর্তমান মাছ মৃত্যুর ঘটনায় ঠিক একই কারণ কাজ করেছে কি না, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
কচুরিপানা ও পচনশীল আবর্জনাও উদ্বেগের কারণ
স্থানীয়দের ভাষ্য, তালতলী মৎস্য অভয়াশ্রম এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কচুরিপানা ও বিভিন্ন ধরনের জলজ আবর্জনা জমে রয়েছে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পচনশীল জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়তে পারে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা।

বারনই নদী নিয়ে আয়োজিত পূর্ববর্তী এক আলোচনা সভায়ও নদীর বিভিন্ন অংশে কচুরিপানা, নাব্যতা সংকট ও বর্জ্য জমে থাকার বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে নদীর একটি অংশে দীর্ঘদিন ধরে কচুরিপানা জমে নৌচলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার কথাও বলা হয়।

তবে কচুরিপানা জমে থাকাই বর্তমান মাছ মৃত্যুর সরাসরি কারণ—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে পানির রাসায়নিক ও জীববৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।

অভয়াশ্রম রক্ষার প্রশ্ন

বারনই নদীতে মাছ ও জলজ প্রাণী রক্ষায় মৎস্য বিভাগের কার্যক্রমের তথ্যও রয়েছে। ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট বাগমারায় বারনই নদী ও ফকিরনী নদীর সংযোগস্থলে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জালবিরোধী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জাল জব্দ ও ধ্বংস করা হয়।

কিন্তু মাছ ধরার নিষিদ্ধ পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নদীর পানির গুণগত মান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অভয়াশ্রমের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এখনই প্রয়োজন পানি পরীক্ষা

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে বারনই নদীর তালতলী মৎস্য অভয়াশ্রমের পানি ও মৃত মাছের নমুনা দ্রুত পরীক্ষাগারে পাঠানো। পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন, অ্যামোনিয়া, পিএইচ, জৈব দূষণসহ প্রয়োজনীয় সূচক পরীক্ষা করলে মাছ মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারণা পাওয়া যাবে।
একই সঙ্গে নদীর পানিতে কোনো রাসায়নিক বা বিষাক্ত পদার্থ মেশানো হয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের কচুরিপানা ও পচনশীল বর্জ্য জমে পানির অক্সিজেন কমে গেছে কি না, তাও পরীক্ষা করে দেখা জরুরি।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু মরা মাছ তুলে নেওয়া নয়, ঘটনার মূল কারণ খুঁজে বের করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

তালতলী মৎস্য অভয়াশ্রম থেকে কচুরিপানা ও বর্জ্য

অপসারণ, নদীর পানির নিয়মিত মান পরীক্ষা এবং নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বারনই নদী ঘিরে দীর্ঘদিনের দূষণ, নাব্যতা সংকট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে নতুন করে মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি দিনের মাছ মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি নদীটির দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত সংকট কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তারও একটি সতর্ক সংকেত।

তবে বর্তমান ঘটনার প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সরকারি পানি ও মাছের পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।