ব্যাংকিংয়ের কঠিন সময়ে আস্থার জায়গা তৈরি করছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক

ছবি: এআই

সুশাসন, ডিজিটাল সেবা ও আর্থিক সক্ষমতায় ধারাবাহিক অগ্রগতি; গ্রাহকের আস্থা ধরে রেখে প্রবৃদ্ধির পথে এমটিবি

টুইট প্রতিবেদক: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা আরও শক্ত করছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি (এমটিবি)। ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করা বেসরকারি এই বাণিজ্যিক ব্যাংকটি গত ২৬-২৭ বছরে সুশাসন, গ্রাহকসেবা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ও টেকসই অর্থায়নের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে।

ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এত বছরে ব্যাংকটিতে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি। গ্রাহকদের সঙ্গে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা পূরণ করা হয়েছে। মানুষের আস্থার ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তার মধ্যেই এমটিবির সুনাম ও সেবার মান নতুন আমানত আকর্ষণ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

আর্থিক সক্ষমতায় ধারাবাহিকতা

৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সমাপ্ত অর্থবছরের অডিটেড আর্থিক বিবরণী অনুসারে, এমটিবির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩২৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের ৩১১ কোটি ৬ লাখ টাকার তুলনায় বেড়েছে। শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৩ টাকা ২ পয়সা (২০২৪ সালে ছিল ২ টাকা ৮৮ পয়সা)। শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১২ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়।

একই সময়ে ব্যাংকটির মোট সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা (আগের বছর ৪৫ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা)। মোট আমানত ৩৬ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা এবং ঋণ ও অ্যাডভান্স ৩১ হাজার ৭২৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ঋণ-আমানত অনুপাত ছিল ৭৫ দশমিক ০৬ শতাংশ।

জাতীয় সাইবার ড্রিল ২০২৬-এ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড বিজনেস আউটলুকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কারেও সেরা বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ একাধিক স্বীকৃতি পেয়েছে।

খেলাপি ঋণের অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশে নেমে এসেছে (আগের বছর ৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ)। মোট শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটি ২ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) বেড়ে ২৭ টাকা ৫৯ পয়সায় দাঁড়িয়েছে (আগের বছর ২৩ টাকা ১৮ পয়সা)।

ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন অনুপাত (সিআরএআর) ছিল ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং মোট নিয়ন্ত্রকীয় মূলধন ৪ হাজার ২১৮ কোটি টাকার কাছাকাছি। মূলধন সক্ষমতা আরও বাড়াতে ২৫ আগস্ট ২০২৬-এর বোর্ড সভায় ৫০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি শরিয়াহসম্মত বা প্রচলিত অধীনস্থ বন্ড ইস্যুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে বড় অগ্রগতি

প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ে এমটিবির অন্যতম প্রধান উদ্যোগ ‘এমটিবি নিও’। এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ফিক্সড ডিপোজিট ও ডিপিএসের পরিমাণ ইতোমধ্যে ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে নিও প্ল্যাটফর্মে লেনদেনের পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। ডিজিটাল হিসাব খোলার হার বেড়েছে ১৭০ শতাংশ এবং ই-কেওয়াইসি হিসাব খোলার হার বেড়েছে ১ হাজার ৬৭৮ শতাংশ। তাই আমানত রক্ষাকারী ব্যাংক হিসেবে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করছে এমটিবি।

এমটিবি দেশের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা (পিএফএম) সুবিধা চালু করেছে। পাশাপাশি টরিট ই-ঋণসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ঋণসেবা চালু করে গ্রাহকদের ব্যাংকিং আরও সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। শাখায় না গিয়েই অনলাইনে অ্যাকাউন্ট খোলা, হোম লোনে ৪৮ ঘণ্টায় শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন অর্থায়নেও অগ্রগতি দেখা গেছে।

দেশ-বিদেশে স্বীকৃতি

ব্যাংকটির ডিজিটাল সক্ষমতা ও সামগ্রিক কার্যক্রম বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্বীকৃতি পেয়েছে। ইউরোমানি অ্যাওয়ার্ডস ফর এক্সিলেন্সে টানা দুই বছর—২০২৫ ও ২০২৬ সালে—বাংলাদেশের সেরা ডিজিটাল ব্যাংক নির্বাচিত হয়েছে এমটিবি। বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই ব্যাংকিং তালিকায় শীর্ষ ১০-এ স্থান পেয়েছে ব্যাংকটি। জাতীয় সাইবার ড্রিল ২০২৬-এ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড বিজনেস আউটলুকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কারেও সেরা বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ একাধিক স্বীকৃতি পেয়েছে।

অগ্রাধিকার খাতে অর্থায়নে জোর

সাম্প্রতিকতম অগ্রগতি হিসেবে ২৭ আগস্ট ২০২৬-এ বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪১ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন প্যাকেজে অংশ নিয়ে অগ্রাধিকার খাতে স্বল্প সুদে প্রাক্‌-অর্থায়ন ও পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা দেওয়ার চুক্তি সই করেছে এমটিবি। এই প্যাকেজ ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে উৎপাদনশীল খাতে কম খরচে ঋণ প্রবাহ বাড়াবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় সহায়তা করবে বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা অর্থায়ন, বৈদ্যুতিক যানবাহন অর্থায়ন, গৃহঋণ এবং পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিংয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে ব্যাংকটি। বর্তমানে এমটিবির ১২২টি শাখা, ৫৮টি উপশাখা, ১৯০টি এজেন্ট ব্যাংকিং কেন্দ্র এবং ৩৪৮টি এটিএম, প্রায় ১০ হাজারের অধিক পজ ও দেশের অভ্যন্তরে ৮টি এয়ার লাউন্স রয়েছে। নরফান্ড-নরওয়ের উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান—এমটিবির অন্যতম বড় শেয়ারহোল্ডার।

ব্যাংকিং খাতে যখন আস্থা, সুশাসন ও সম্পদের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে, তখন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, গ্রাহককেন্দ্রিক কার্যক্রম এবং সুশাসনকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এমটিবি। ২০২৫ সালের অডিটেড আর্থিক বিবরণীতে সম্পদের প্রবৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ হ্রাস, মুনাফা বৃদ্ধি এবং মূলধন সক্ষমতার উন্নতিই প্রমাণ করে যে, ব্যাংকটি ধারাবাহিকভাবে গ্রাহকদের কাছে আস্থার একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে।

সূত্র: এমটিবি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, The Business Standard, The Financial Express, DSE ডিসক্লোজার, ২০২৫ অডিটেড আর্থিক বিবরণী, Euromoney Awards।