ভুয়া সনদে চাকরি, এবার এমপিওভুক্ত হতে অধ্যক্ষের তোড়জোড়

বিভাগ চালুর আগেই সনদে পাসের দাবি, মাউশির তদন্তে অযোগ্য হলেও চলছে এমপিওভুক্তির চেষ্টা

টুইট ডেস্ক: বরগুনার আমতলী উপজেলার ড. মো. শহীদুল ইসলাম কলেজে নিয়োগ ও এমপিওভুক্তি ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মাসুমা আক্তার খাদিজার বিরুদ্ধে ভুয়া সনদ ব্যবহার করে চাকরি নেওয়া এবং যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও সরকারি বেতন-ভাতার আওতায় আসার চেষ্টা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের একাধিক তদন্তেও তার এমপিওভুক্তির সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ড. মো. শহীদুল ইসলামের স্ত্রী মাসুমা আক্তার খাদিজাকে ২০১৩ সালে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্বে আসেন। তবে নিয়োগের সময় তিনি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিভাগ চালুর আগেই সনদে পাস

মাসুমা আক্তার খাদিজা অধ্যক্ষ পদের যোগ্যতা হিসেবে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড সিভিলাইজেশন বিষয়ে স্নাতক সম্মান পাসের সনদ জমা দিয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

সনদ অনুযায়ী, তিনি ২০০৫ সালে প্রথম সেমিস্টার এবং ২০০৮ সালে চূড়ান্ত সেমিস্টার সম্পন্ন করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বিভাগটি চালু হয় ২০০৬ সালে। ফলে বিভাগ চালুর আগেই ওই বিষয়ে ভর্তি হয়ে সনদ অর্জনের দাবিটি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এ ছাড়া এমপিওভুক্তির আবেদনে তিনি বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাগত সনদ জমা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব নথিতে ২০০৬ সালে ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় স্নাতক সম্মান, ২০০৮ সালে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর এবং ২০১২ সালে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার তথ্য রয়েছে। অনুসন্ধানে এসব সনদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

মাউশির তদন্তে এমপিওভুক্তির সুযোগ নেই

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রধান কার্যালয়ের পৃথক তদন্ত প্রতিবেদনে অধ্যক্ষ মাসুমা আক্তার খাদিজার এমপিওভুক্ত হওয়ার আইনগত সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ২ অক্টোবর এবং ২০২৫ সালের ১৩ আগস্টের তদন্ত প্রতিবেদনে তার এমপিওভুক্তির বিষয়ে নেতিবাচক মত দেওয়া হয়। এরপরও তিনি এমপিওভুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

কলেজটির আরও কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধেও নিয়োগ ও সনদসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে। হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক নাসির উদ্দীনের সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে এমপিওভুক্তির চেষ্টা চালানোর অভিযোগও তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০২৪ সালের ৩ এপ্রিলের তদন্তে তার এমপিওভুক্তির সুযোগ নেই এবং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সুপারিশ করা হয়।

অধ্যক্ষের দাবি, কলেজ বাঁচাতেই দায়িত্ব নিয়েছেন

অভিযোগের বিষয়ে অধ্যক্ষ মাসুমা আক্তার খাদিজা বলেন, মাউশির তদন্ত প্রতিবেদনে তার কাম্য যোগ্যতা নেই বলা হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় বেতন-ভাতা ছাড়া কেউ চাকরি করতে পারেন কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তিনি দাবি করেন, তার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত কলেজটি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেখে তিনি সেখানে দায়িত্ব নিয়েছেন। সর্বশেষ তদন্তের কাগজপত্রও তারা বরিশালে গিয়ে জমা দিয়েছেন এবং এতে কোনো সমস্যা হবে না বলে তিনি আশা করছেন।

বিভাগ চালুর আগেই কীভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন-এমন প্রশ্নের সরাসরি ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি। এশিয়ান ইউনিভার্সিটির কোন ক্যাম্পাসে পড়াশোনা করেছেন, সে বিষয়েও তিনি স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।

মাউশির বক্তব্য

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, কলেজটির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর একাধিকবার তদন্ত হয়েছে। সর্বশেষ একটি তদন্তও চলছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত এমপিওভুক্তির কোনো সুযোগ নেই।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, নিয়মের ব্যত্যয় হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুয়া নিয়োগ কিংবা অনিয়ম করে এমপিওভুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

অভিযোগের বিষয়ে কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষের স্বামী ড. মো. শহীদুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।