ব্যাংকের অদক্ষ টার্গেট-প্রথা বদলাতেই হবে: সকালের ব্রিফিং যখন ‘টর্চার সেল’

কলাম । ব‌দিউল আলম লিংকন:

স্যার, কীভাবে আপনাকে সহযোগিতা করতে পারি?’—ব্যাংকের ফ্রন্ট ডেস্কে দিনের শুরুটা এমন সেবামূলক সংলাপ দিয়েই হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। গ্রাহক আসার আগেই সামনের সারির কর্মকর্তাকে শুনতে হয়—‘আজকের টার্গেট কত, কতটা পূরণ হয়েছে?’ হিসাব, কার্ড, আমানত কিংবা ঋণ সংগ্রহের দৈনিক চাপ দিয়ে শুরু হয় কর্মদিবস। সেবার দায়িত্বে থাকা এই কর্মীদের কাছে এমন সকাল অনেক সময় ‘টর্চার সেল’ বলেই মনে হয়। অথচ কাউন্টার খোলার মুহূর্তে তাঁদের মনোযোগ থাকার কথা গ্রাহকের প্রয়োজন, সঠিক তথ্য ও নির্ভুল সেবায়। এখানেই প্রশ্ন?

ব্যাংকের সকাল শুরু হওয়ার কথা গ্রাহকসেবা, প্রস্তুতি ও দিনের কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে সাজানোর মধ্য দিয়ে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দিনের শুরুতেই সামনের সারির সেবাকর্মীদের নিয়ে অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রা, আগের দিনের ঘাটতির হিসাব এবং তাৎক্ষণিক অর্জনের চাপ তৈরি করা হয়। ফলে সুনামধন‌্য ব‌্যাংকগু‌লো‌তে কর্মদিবসের শুরুটাই কারও কারও জন্য এক ধরনের ‘সকালের টর্চার সেল’-এ পরিণত হ‌য়ে‌ছে।

একজন ব‌্যাংকার‌কে মানসিক চাপ নিয়ে কাউন্টার খুলতে হয়, অথচ দিনের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত নির্বিঘ্ন ও নির্ভুল সেবাদান। সকালেই যদি কর্মীকে ‘আজ কত হিসাব, কত কার্ড, কত আমানত, কত ঋণ’—এই সংখ্যার চাপে ফেলা হয়, তাহলে সেবার মান, পরিপালন ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের চেয়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণই অগ্রাধিকার পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই কর্মদিবসের শুরুটা চাপের হিসাব দিয়ে নয়, সুশৃঙ্খল ব্যাংকিং কার্যক্রমের প্রস্তুতি দিয়ে হওয়াই যুক্তিসঙ্গত।

ব্যাংকের ফ্রন্ট ডেস্ক গ্রাহকের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। একজন মানুষ শাখায় প্রবেশ করার পর প্রথম যে কর্মীর সঙ্গে কথা বলেন, তাঁর আচরণ থেকেই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আস্থা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্বের প্রাথমিক ধারণা তৈরি হয়। হিসাব খোলা, নগদ লেনদেনের তথ্য, চেকসংক্রান্ত নির্দেশনা, কার্ড, সনদ, হিসাবের বিবরণ, অভিযোগ গ্রহণ, বিভিন্ন সেবার নিয়ম বোঝানো কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো—এসব দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি বিক্রয়-লক্ষ্য জুড়ে দিলে সেবাকেন্দ্রের মূল চরিত্রই বদলে যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহকসেবা ও অভিযোগ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত নির্দেশনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে শুধু মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, জনগণকে আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবেও বিবেচনা করা হয়েছে। সেখানে সেবার মান, নৈতিক আচরণ, গ্রাহক সচেতনতা এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে সামনের সারির কর্মীর কাজের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত প্রয়োজন বোঝা, সঠিক তথ্য দেওয়া এবং নির্ভুলভাবে সেবা নিশ্চিত করা; নির্দিষ্ট সংখ্যক পণ্য বিক্রি করা তার একমাত্র পরিচয় হতে পারে না।

ফ্রন্ট ডেস্কের ভুলের প্রভাব ছাড়িয়ে যায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায়

ব্যাংকের অন্যান্য অনেক কার্যক্রম গ্রাহকের চোখের আড়ালে সম্পন্ন হলেও কাউন্টারের সামনে হওয়া প্রতিটি কাজ সরাসরি সেবাগ্রহীতার অভিজ্ঞতার অংশ। একজন ব্যক্তি টাকা জমা, হিসাবসংক্রান্ত তথ্য, চেক, কার্ড বা অন্য কোনো সুবিধা নিতে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে এবং একই সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীকে সম্ভাব্য ক্রেতার তালিকা তৈরি, ফোন করা কিংবা নতুন পণ্য উপস্থাপনের চাপ সামলাতে হলে সেবার গতি ও মান—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখানে সামান্য ভুলও পরে বড় সমস্যায় রূপ নিতে পারে। ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ কাগজপত্র, পরিচিতি যাচাইয়ে ঘাটতি, হিসাবসংক্রান্ত ভুল নির্দেশনা কিংবা প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ না করার মতো বিষয় থেকে অভিযোগ, প্রতারণা, অর্থপাচারসংক্রান্ত বিপত্তি, আর্থিক ক্ষতি কিংবা প্রতিষ্ঠানের সুনামহানি পর্যন্ত ঘটতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোতেও ভুল প্রক্রিয়া, অদক্ষ জনবল, নথিপত্রের ঘাটতি, কর্মীর প্রতারণা এবং নিয়ম না মানাকে পরিচালনাগত ঝুঁকির উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

সেবা ও বিক্রয় একই চেয়ারে দ্বৈত চাপ

একজন সামনের সারির কর্মীকে একই সময়ে দ্রুত সেবা, কম অপেক্ষার সময়, অভিযোগ মোকাবিলা, নির্ভুল নথিপত্র এবং গ্রাহকের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সংখ্যক হিসাব, কার্ড, ঋণ, আমানত বা অন্যান্য পণ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকারের সংঘাত তৈরি হয়।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি নতুন হিসাব খুলতে এসেছেন। তাঁর আর্থিক সক্ষমতা, লেনদেনের ধরন ও প্রয়োজন বিবেচনা করে উপযুক্ত হিসাব বা পণ্য সম্পর্কে জানানোই স্বাভাবিক পদ্ধতি। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর মাসিক কর্মদক্ষতার বড় অংশ যদি নির্দিষ্ট সংখ্যক কার্ড বা নির্দিষ্ট পরিমাণ আমানত সংগ্রহের ওপর নির্ভর করে, তাহলে তাঁর সিদ্ধান্তে অদৃশ্য চাপ কাজ করতে পারে। তখন ‘কোন সুবিধাটি এই ব্যক্তির জন্য উপযুক্ত’—এর বদলে ‘কোন পণ্যের লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি’—এই চিন্তা প্রাধান্য পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

এটি কেবল তাত্ত্বিক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং অভিজ্ঞতায় বিক্রয়-প্রণোদনা ও পারিশ্রমিক কাঠামোকে ভুল আর্থিক পণ্য বিক্রির সম্ভাব্য চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউরোপীয় ব্যাংকিং কর্তৃপক্ষের নীতিগত আলোচনায় কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে শুধু সংখ্যাগত অর্জন নয়, সেবাগ্রহীতার স্বার্থ, সন্তুষ্টি ও সম্ভাব্য ক্ষতিকেও বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কর্মীর ওপর চাপ শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের দায়

অতিরিক্ত বিক্রয়-লক্ষ্যকে শুধু মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয় ভাবলে সমস্যার পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে পরিচালনাগত, আচরণগত, পরিপালনগত, গ্রাহক এবং সুনামগত ঝুঁকিও জড়িয়ে আছে।

একজন কর্মী যদি মনে করেন নির্ধারিত সংখ্যা পূরণ না করলে কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, পদোন্নতির সুযোগ কমবে কিংবা ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের চাপ বাড়বে, তাহলে তাঁর আচরণে সেই চাপের প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।

আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক আলোচনাতেও দেখা গেছে, বিক্রয়-চাপ শুধু আর্থিক পুরস্কারের মাধ্যমে নয়; কর্মীর মূল্যায়ন, পদ কিংবা চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মাধ্যমেও তৈরি হতে পারে। মাসের শেষ দিকে নির্দিষ্ট সংখ্যক ক্রেডিট কার্ডের লক্ষ্য পূরণ হয়নি—এমন পরিস্থিতিতে একজন কর্মীর সামনে দুটি পথ থাকে। একদিকে রয়েছে সম্ভাব্য গ্রাহকের প্রকৃত প্রয়োজন যাচাই করে সময় নিয়ে উপযুক্ত পণ্য সম্পর্কে বোঝানো; অন্যদিকে দ্রুত কয়েকজনকে পণ্য গ্রহণে রাজি করিয়ে সংখ্যাটি পূরণ করা। দ্বিতীয় পদ্ধতি যদি প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতা ব্যবস্থায় বেশি মূল্য পায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি গ্রাহকস্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আচরণকে প্রতিষ্ঠান অনিচ্ছাকৃতভাবে উৎসাহিত করতে পারে।

এক মাসের অর্জন বনাম দীর্ঘমেয়াদি দায়

কোনো ব্যাংকিং পণ্য বিক্রি হলেই ব্যবসায়িক সাফল্য নিশ্চিত হয় না। বরং ভুল পণ্য বা ভুল পদ্ধতিতে বিক্রয়ের পরেই প্রকৃত দায় সামনে আসতে পারে। প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন পণ্য গ্রহণের পর অভিযোগ, বাতিলের আবেদন, অনাদায়, বিরোধ, ক্ষতিপূরণ দাবি কিংবা নিয়ন্ত্রক পর্যবেক্ষণের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তখন মাসিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অর্জনটি আর বড় মনে নাও হতে পারে।

এ কারণেই কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন শুধু ‘কতটি পণ্য বিক্রি হলো’ বা ‘কত টাকা সংগ্রহ হলো’—এ দুই প্রশ্নে আটকে থাকা উচিত নয়। সেবার মান, অভিযোগের হার, পরিপালন, তথ্যের নির্ভুলতা, ঝুঁকির ব্যয়, গ্রাহকের সন্তুষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কও মূল্যায়নের অংশ হওয়া প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায়ও এ ধরনের ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ব্যাংকিং কর্তৃপক্ষের মূল্যায়নে গ্রাহক সন্তুষ্টি ও গ্রাহকের ক্ষতির মতো সূচক কর্মদক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করা, গ্রাহকের ক্ষতি হলে প্রণোদনা কমানো এবং শুধু বিক্রয়কে পদোন্নতির প্রধান ভিত্তি না করার মতো পদ্ধতিকে ভালো চর্চা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

পণ্য জানানো হোক, চাপিয়ে দেওয়া নয়

ফ্রন্ট ডেস্কে ব্যাংকিং পণ্য সম্পর্কে তথ্য দেওয়া বন্ধ করার প্রশ্নই ওঠে না। বরং কোনো ব্যক্তি জানতে চাইলে তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী হিসাব, কার্ড বা অন্য সুবিধার বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা সেবারই অংশ। ঋণের প্রয়োজন থাকলে সংশ্লিষ্ট ঋণ কর্মকর্তার কাছে পাঠানোও যথাযথ দায়িত্ব। সমস্যা শুরু হয় যখন প্রয়োজন শনাক্তকরণের জায়গা দখল করে বাধ্যতামূলক বিক্রয়। কোনো ব্যক্তির প্রয়োজন নেই, তবুও কর্মীর ব্যক্তিগত লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য পণ্য নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হলে সেটি প্রকৃত অর্থে পরামর্শভিত্তিক ব্যাংকিং থাকে না; তা পরিণত হয় সংখ্যাভিত্তিক বিক্রয়ে। সুস্থ ব্যাংকিং সংস্কৃতিতে কর্মীকে এমনভাবে মূল্যায়ন করা উচিত, যাতে তিনি গ্রাহকের প্রয়োজনের সঙ্গে ব্যাংকের পণ্যের যথাযথ মিল ঘটাতে উৎসাহিত হন।

বেশি পণ্য বিক্রি করলেই বেশি দক্ষ—এই সরল সমীকরণ দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের জন্য নিরাপদ নয়।

অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণেও এর প্রভাব রয়েছে

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভিত্তি হলো দায়িত্বের যথাযথ বিভাজন, যাচাই, অনুমোদন, নথিপত্র সংরক্ষণ এবং নিয়মের পরিপালন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন কাঠামোতেও পরিচালনাগত ঝুঁকি শনাক্ত, মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই ব্যক্তির ওপর গ্রাহক ব্যবস্থাপনা, অভিযোগ মোকাবিলা, নথিপত্র, নিয়মের পরিপালন এবং আক্রমণাত্মক বিক্রয়-লক্ষ্য একসঙ্গে চাপানো হলে কাজের অগ্রাধিকার বদলে যেতে পারে। দ্রুত সংখ্যা পূরণের তাগিদে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই, তথ্যের নির্ভুলতা কিংবা নথিপত্রের মান অবহেলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এখানেই ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতার চাপ একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে।

এ কারণে বিষয়টিকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই সংস্কৃতি যদি একাধিক প্রতিষ্ঠানে বিস্তার লাভ করে, তাহলে পুরো ব্যাংকিং খাতেই আচরণগত ও সুনামগত ঝুঁকি বাড়তে পারে।

‘বেশি বিক্রি মানেই ভালো কর্মী’—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে সেবার মান ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ধীরে ধীরে দ্বিতীয় সারিতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

নিয়ন্ত্রকের দৃষ্টিতে বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শনে ঋণঝুঁকি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন, সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনা এবং তথ্যপ্রযুক্তি ঝুঁকিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র পর্যালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে গ্রাহকসেবা, সুশাসন, জালিয়াতি ও অনিয়মও নজরদারির আওতায় থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে শাখার সামনের সারির কর্মীরা কেবল সেবাদানকারী নন; অনেক ক্ষেত্রে তাঁরাই গ্রাহকের সমস্যার প্রথম সমাধানকারী এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার প্রথম পরীক্ষাস্থল। সেই জায়গায় অতিরিক্ত ব্যবসায়িক চাপ তৈরি হলে তার প্রভাব কেবল কর্মীর মানসিক অবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকে না; সেবার গুণমান, অভিযোগের প্রবণতা, পরিপালন এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিতেও পড়তে পারে।

প্রয়োজন ‘স্মার্ট টার্গেট’, অন্ধ টার্গেট নয়

ব্যাংকের ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। আমানত বাড়ানো, ঋণ বিতরণ, কার্ড সম্প্রসারণ কিংবা নতুন সেবা পৌঁছে দেওয়া একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম। কিন্তু সব দায়িত্বের জন্য একই ধরনের সংখ্যাভিত্তিক চাপ প্রয়োগ করা বুদ্ধিমান কর্মদক্ষতা ব্যবস্থাপনা নয়।
সামনের সারির কর্মীদের মূল্যায়নে সেবার সময়, তথ্যের নির্ভুলতা, অভিযোগ নিষ্পত্তির মান, পরিপালন, নথিপত্রের যথার্থতা, গ্রাহকের সন্তুষ্টি এবং প্রয়োজনভিত্তিক পণ্য-সংযোগের মতো সূচক যুক্ত করা যেতে পারে। ব্যবসায়িক অর্জন থাকলেও সেটি মোট মূল্যায়নের একমাত্র বা প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত নয়।

বিশেষ করে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সময় ঝুঁকি-সমন্বিত কর্মদক্ষতা পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। কোনো কর্মী কত পণ্য বিক্রি করেছেন—এর পাশাপাশি সেই বিক্রয় থেকে কতটি অভিযোগ তৈরি হয়েছে, কতটি হিসাব নিষ্ক্রিয় হয়েছে, কতটি পণ্য বাতিল হয়েছে, কোনো পরিপালনগত সমস্যা হয়েছে কি না এবং গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা টেকসই হয়েছে—এসবও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।

ব্যাংকের ফ্রন্ট ডেস্কের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হবে

একটি ব্যাংকের সামনের সারির সেবাকেন্দ্র কোনো সাধারণ বিক্রয়কেন্দ্র নয়। এটি গ্রাহকসেবা, তথ্যের নির্ভুলতা, পরিপালন, প্রাথমিক ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ স্তর। তাই সেখানে কর্মরত ব্যক্তিকে শুধু বিক্রয়ের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে তাঁর প্রকৃত দায়িত্বের মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংকিং ব্যবসার ভিত্তি শুধু নতুন পণ্য বিক্রি নয়। স্থিতিশীল আমানত, মানসম্পন্ন ঋণ, কম অভিযোগ, কম পরিচালনাগত ক্ষতি, শক্তিশালী পরিপালন এবং দীর্ঘস্থায়ী গ্রাহকসম্পর্কই একটি প্রতিষ্ঠানের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে। একটি পণ্য বিক্রির তাৎক্ষণিক সাফল্যের চেয়ে একজন সন্তুষ্ট ও আস্থাশীল সেবাগ্রহীতাকে বছরের পর বছর ধরে রাখা অনেক বেশি মূল্যবান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোও পরিচালনাগত ঝুঁকি যথাযথভাবে শনাক্ত, মূল্যায়ন, পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেয়। তাই কর্মীদের ওপর ব্যবসায়িক চাপ তৈরির আগে সেই চাপ ভবিষ্যতে কী ধরনের পরিচালনাগত ও পরিপালনগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ব্যাংকিং খাতের সামনে এখন মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু ‘কত অর্জন হলো’ নয়—‘কীভাবে অর্জন হলো এবং সেই অর্জনের সঙ্গে ভবিষ্যতের কী ঝুঁকি তৈরি হলো?’ এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া টেকসই ব্যাংকিং সম্ভব নয়।

ফ্রন্ট ডেস্ক কর্মকর্তাকে সেবাদাতা থেকে জোরপূর্বক বিক্রয়কর্মীতে পরিণত করার সংস্কৃতি তাই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে দিনের শুরুতেই অতিরিক্ত চাপ, প্রকাশ্য ঘাটতির হিসাব ও তাৎক্ষণিক বিক্রয়-লক্ষ্যের সংস্কৃতি বন্ধ করে কর্মপরিবেশকে পেশাদার, মানবিক ও ঝুঁকি-সচেতন করা জরুরি।

ব্যাংকের সকাল শুরু হোক সেবার প্রস্তুতিতে, ‘টর্চার সেল’-এ নয়। ফ্রন্ট ডেস্ক থাকুক সেবার জায়গায়, আর বিক্রয় হোক প্রয়োজনের ভিত্তিতে—চাপের ভিত্তিতে নয়। কারণ ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি শক্তি শুধু মূলধন বা মুনাফায় নয়; এর বড় ভিত্তি হলো মানুষের আস্থা। আর সেই আস্থার প্রথম মুখ হয়ে দাঁড়ায় সামনের সারির ব্যাংককর্মী।