ঈদে মিলাদুন্নবী আজ: নবীজির জীবনাদর্শ স্মরণের দিন

দরুদ-সালাম, সীরাত আলোচনা ও দান-সদকার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে পবিত্র দিনটি; উদযাপনের শারঈ অবস্থান নিয়ে আলেমদের মধ্যে রয়েছে মতভেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ বুধবার (২৬ আগস্ট) ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি। বাংলাদেশে দিনটি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) হিসেবে পালিত হচ্ছে।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও জীবনাদর্শ স্মরণে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় আলোচনা, দোয়া-মাহফিল, দরুদ-সালাম, সীরাত পাঠ, দান-সদকা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশিত ইসলামি পর্বের তালিকাতেও ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি, ২৬ আগস্ট ২০২৬-কে ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঈদে মিলাদুন্নবী বা মওলিদ আন-নবি বলতে মূলত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মস্মরণকে কেন্দ্র করে পালিত ধর্মীয় ও সামাজিক আয়োজনকে বোঝানো হয়। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর পালনপদ্ধতিতে ভিন্নতা রয়েছে। কোথাও সীরাত মাহফিল, কোরআন তিলাওয়াত ও দরুদ-সালামের মাধ্যমে দিনটি পালন করা হয়; কোথাও জুলুস, আলোকসজ্জা, নাত পাঠ এবং দরিদ্রদের মধ্যে খাবার বিতরণের মতো কর্মসূচিও থাকে।

সোমবার জন্মের কথা সহিহ হাদিসে মহানবী (সা.)-এর জন্মদিনের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে তিনি সোমবার জন্মগ্রহণ করেছিলেন—এ বিষয়টি সহিহ মুসলিমের হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে। আবু কাতাদা (রা.)-এর বর্ণনায়, সোমবারে রোজা রাখার কারণ জানতে চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এটি তাঁর জন্মের দিন এবং এ দিনেই তাঁর ওপর ওহি নাজিল হয়েছিল।

ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনায় তাঁর জন্মের বছর হিসেবে ‘আমুল ফিল’ বা হস্তীর বছরকে উল্লেখ করা হয়। জন্মতারিখ হিসেবে ১২ রবিউল আউয়াল সবচেয়ে বেশি প্রচলিত হলেও ২, ৮, ১০ ও ১২ রবিউল আউয়ালসহ একাধিক মত পাওয়া যায়। ফলে ১২ রবিউল আউয়ালকে সর্বসম্মত ঐতিহাসিক জন্মতারিখ হিসেবে উপস্থাপন না করে প্রচলিত মত হিসেবে উল্লেখ করাই অধিকতর সতর্ক অবস্থান।

কীভাবে শুরু হলো মওলিদ আয়োজন

মহানবী (সা.), সাহাবায়ে কেরাম ও ইসলামের প্রাথমিক যুগে বর্তমান অর্থে বার্ষিক মওলিদ আয়োজনের প্রমাণ পাওয়া যায় না—এটি নিয়ে ইসলামি ঐতিহ্যের বিভিন্ন ধারার আলেমদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। পরবর্তী মুসলিম ইতিহাসে নবীজির জন্মস্মরণকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিক আয়োজনের বিকাশ ঘটে।

ঐতিহাসিক গবেষণায় ফাতিমীয় শাসনামলে মিসরে বিভিন্ন জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাজকীয় আয়োজনের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে সুন্নি মুসলিম শাসনাধীন বিভিন্ন অঞ্চলেও মওলিদ উৎসবের বিস্তার ঘটে। বিশেষ করে ইরবিলের শাসক মুজাফফর উদ্দিন কুকবুরির আমলে বৃহৎ পরিসরে মওলিদ আয়োজনের ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে এটি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে।

ভালোবাসা প্রকাশের নানা আয়োজন

ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে মুসলমানদের একটি বড় অংশ মহানবী (সা.)-এর জীবন, চরিত্র ও মানবিক শিক্ষাকে স্মরণ করেন। মসজিদ ও ইসলামি প্রতিষ্ঠানে সীরাত আলোচনা, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ-সালাম ও নাত পরিবেশন করা হয়। অনেক স্থানে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ, দান-সদকা এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচিও নেওয়া হয়।

নবীজির জীবনাদর্শের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মানুষের প্রতি দয়া, ন্যায়বিচার, আমানতদারি, সত্যবাদিতা ও দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষা। তাই দিনটির তাৎপর্যকে কেবল আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ বাস্তব জীবনে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে থাকেন বহু আলেম।

উদযাপন নিয়ে মতভেদ

ঈদে মিলাদুন্নবী পালন নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে দীর্ঘদিনের মতভেদ রয়েছে। একদল আলেম ও ইসলামি চিন্তাবিদ মনে করেন, নবীজির জন্মস্মরণ, সীরাত আলোচনা, দরুদ পাঠ, দান-সদকা ও তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের উদ্দেশ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠান ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যদি তাতে শরিয়তবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড যুক্ত না হয়।
অন্যদিকে আরেক দল আলেমের মত হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম ও প্রাথমিক মুসলিম প্রজন্ম এভাবে বার্ষিক জন্মোৎসব পালন করেননি। তাই ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে মওলিদ পালনকে তাঁরা বিদআত হিসেবে বিবেচনা করেন। এ মতভেদের কারণে বিষয়টি নিয়ে মুসলিম সমাজে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান রয়েছে।

ফলে ঈদে মিলাদুন্নবীকে কেন্দ্র করে মতপার্থক্য থাকলেও মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর চরিত্র ও শিক্ষা অনুসরণ এবং মানবকল্যাণে কাজ করার বিষয়ে মুসলমানদের মধ্যে মৌলিক গুরুত্ব রয়েছে।

নবীজির আদর্শই হোক মূল শিক্ষা

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ছিল মানবতার জন্য নৈতিক ও সামাজিক আদর্শের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর শিক্ষা ছিল সত্য, ন্যায়, দয়া, ক্ষমা, প্রতিবেশীর অধিকার, এতিম-দরিদ্রের প্রতি দায়িত্ব এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

তাই ঈদে মিলাদুন্নবীর তাৎপর্য কেবল একটি দিনকে ঘিরে আনুষ্ঠানিকতা পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নবীজির আদর্শকে ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে বাস্তবায়নের মধ্যেই নিহিত। তাঁর শিক্ষা অনুসরণ করে মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যয়ই হতে পারে এ দিনের সবচেয়ে অর্থবহ বার্তা।

সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৬২; বাংলাদেশ সরকারের ২০২৬ সালের ইসলামি পর্বের তালিকা; মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের ঈদে মিলাদুন্নবী সংক্রান্ত অফিস আদেশ।