রাজশাহী-ঢাকা আকাশপথে ফ্লাইট সংকট: চড়া ভাড়ায় ভোগান্তিতে যাত্রীরা

আকাশপথে ফ্লাইট সংকট প্রকট: টিকিট দুষ্প্রাপ্য, চড়া ভাড়ায় ভোগান্তি। নভোএয়ার না থাকায় দুই এয়ারলাইন্সের ওপর নির্ভরতা—সপ্তাহে নির্ধারিত ১৭টি সরাসরি ফ্লাইট, চাহিদার সময়ে বাড়ছে ভাড়া; ফ্লাইট বাড়ানোর দাবি।
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী: রাজশাহী-ঢাকা আকাশপথে ফ্লাইটের সীমিত সংখ্যা, নির্দিষ্ট সময়ের আসন দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাওয়া এবং ভাড়ার ঊর্ধ্বগতিতে যাত্রীদের ভোগান্তি ক্রমেই বাড়ছে। জরুরি প্রয়োজনে শেষ মুহূর্তে টিকিট কিনতে গিয়ে গুনতে হচ্ছে তুলনামূলক বেশি অর্থ।
চিকিৎসার জন্য রাজধানীমুখী রোগী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, পর্যটকসহ নিয়মিত যাত্রীদের অনেকেই প্রয়োজনের সময়ে কাঙ্ক্ষিত ফ্লাইটের টিকিট পাচ্ছেন না।
সর্বশেষ প্রকাশিত রুট সূচি অনুযায়ী, রাজশাহী শাহ মখদুম বিমানবন্দর থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। দুই এয়ারলাইন্স মিলিয়ে সপ্তাহে ১৭টি সরাসরি ফ্লাইট নির্ধারিত—ইউএস-বাংলার ১৪টি এবং বিমানের তিনটি। ফ্লাইটে রাজশাহী-ঢাকা দূরত্ব প্রায় ১৯২ কিলোমিটার এবং আকাশপথে সময় লাগে প্রায় ৫০ মিনিট।
বর্তমান সূচিতে ইউএস-বাংলার দুটি ফ্লাইট প্রতিদিন পরিচালিত হচ্ছে—সকালে প্রায় ৮টা ৩৫ মিনিটে এবং সন্ধ্যায় ৬টা ৪০ মিনিটে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট রয়েছে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে; প্রকাশিত সূচিতে সকাল ১০টা ১০ মিনিটের ফ্লাইট এবং শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটের ফ্লাইট দেখা যাচ্ছে।
সকাল ও সন্ধ্যার নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে যাত্রীদের হাতে সরাসরি ফ্লাইটের বিকল্প খুবই সীমিত। কোনো একটি ফ্লাইটের আসন পূর্ণ হয়ে গেলে একই দিনে পছন্দের সময়ে ঢাকায় পৌঁছানোর সুযোগ অনেকের জন্য আর থাকে না। বিশেষ করে চিকিৎসা, পরীক্ষা, ব্যবসায়িক বৈঠক কিংবা জরুরি প্রশাসনিক কাজে যাতায়াতকারীদের জন্য এটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভাড়ায় বড় পার্থক্য
রাজশাহী-ঢাকা রুটের টিকিটের ভাড়াও যাত্রীদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। অনলাইন বুকিংয়ের সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে ২৪ আগস্টের রাজশাহী-ঢাকা রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ইকোনমি টিকিটের মূল্য ৫ হাজার ১৬৬ টাকা দেখা গেছে। এর মধ্যে বেস ভাড়া ৪ হাজার ২৮ টাকা এবং বিভিন্ন সারচার্জ ১ হাজার ১৩৮ টাকা।
বিভিন্ন বুকিং প্ল্যাটফর্মে ভাড়া তারিখ, আসনের প্রাপ্যতা, বুকিংয়ের সময় ও নির্দিষ্ট ফেয়ার শ্রেণি অনুযায়ী পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে কোনো কোনো দিনে বা শেষ মুহূর্তের বুকিংয়ে ভাড়া আরও বেশি হতে পারে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের তথ্যেও আগস্টের শেষ ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে ভাড়ায় উল্লেখযোগ্য তারতম্য দেখা যাচ্ছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, আগে রাজশাহী-ঢাকা রুটে ইকোনমি শ্রেণির টিকিট তুলনামূলক কম দামে পাওয়া গেলেও বর্তমানে চাহিদার সময়ে একমুখী টিকিটের জন্য ৫ হাজার টাকার বেশি গুনতে হচ্ছে। শেষ মুহূর্তে বা সীমিত আসনের সময়ে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
৩১ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক যাত্রীর জন্য বিভিন্ন অনলাইন বুকিং অপশনে যে রাউন্ড ট্রিপের ভাড়া দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে ১০ হাজার ৬৬ টাকা এবং বিমান-ইউএস-বাংলার মিশ্র ফ্লাইটে প্রায় ১০ হাজার ৩২৯ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দেখানোর কথা জানিয়েছেন যাত্রীরা। তবে এই ভাড়া বুকিংয়ের সময়, আসনের প্রাপ্যতা ও ফেয়ার ক্লাস অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
যাত্রীর অভাব নেই, আসনের অভাব
রাজশাহীর যাত্রীদের বড় প্রশ্ন—যদি যাত্রী চাহিদা থাকে, তাহলে ফ্লাইটের সংখ্যা কেন বাড়ছে না?
যাত্রীদের ভাষ্য, রাজশাহী থেকে ঢাকায় যাওয়ার জন্য প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক মানুষের চাহিদা রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ী, রোগী ও স্বজন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন পেশাজীবী নিয়মিত এ রুট ব্যবহার করেন। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পর্যটন।
রাজশাহী শহর, পুঠিয়ার ঐতিহাসিক স্থাপনা, বরেন্দ্র অঞ্চল এবং আশপাশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক স্থানগুলোতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন বাড়ায় আকাশপথের গুরুত্বও বাড়ছে।
এ অবস্থায় যাত্রীদের দাবি, সকালে তিনটি, দুপুরে ও বিকেলে তিনটি করে মোট ছয়টি ফ্লাইট পরিচালনা করা হলেও আসন পূরণ হওয়ার মতো পর্যাপ্ত যাত্রী রয়েছে। তাদের মতে, চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ালে একই সঙ্গে যাত্রী ভোগান্তি ও অতিরিক্ত ভাড়ার চাপ—দুটিই কমানো সম্ভব।
নভোএয়ার না থাকায় কমেছে প্রতিযোগিতা
বর্তমান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে যাত্রীরা দেখছেন নভোএয়ারের অনুপস্থিতিকে। রাজশাহী-ঢাকা রুটে বর্তমানে নির্ধারিত সরাসরি ফ্লাইটে কেবল ইউএস-বাংলা ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উপস্থিতি রয়েছে। রুটের সাম্প্রতিক সূচিগুলোও দুই এয়ারলাইন্সের কার্যক্রমই দেখাচ্ছে।
নভোএয়ার ২০২৫ সালে আর্থিক সংকটের মধ্যে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করেছিল। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বর্তমানে রাজশাহী-ঢাকা রুটের প্রকাশিত নিয়মিত সূচিতে তাদের ফ্লাইট নেই। ফলে একসময় যে রুটে একাধিক বেসরকারি ও সরকারি এয়ারলাইন্সের বিকল্প ছিল, এখন কার্যত দুটি অপারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে যাত্রীদের। এতে কোনো একটি ফ্লাইটের আসন শেষ হয়ে গেলে একই সময়ের কাছাকাছি আরেকটি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে যাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যার ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা বেশি স্পষ্ট।
জরুরি যাত্রীদের ভোগান্তি বেশি
ফ্লাইট সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে জরুরি যাত্রীদের ওপর। চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাওয়া রোগী ও স্বজনদের অনেকের যাত্রার তারিখ আগে থেকে নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। হঠাৎ চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, পরীক্ষা বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে তাদের দ্রুত টিকিট সংগ্রহ করতে হয়।
একইভাবে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও শিক্ষার্থীদেরও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঢাকায় পৌঁছানোর প্রয়োজন হয়। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফ্লাইটের আসন পূর্ণ থাকলে পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সড়কপথে যাতায়াতে দীর্ঘ সময় লাগায় অনেকেই বাধ্য হয়ে বাড়তি অর্থে বিমান টিকিট কেনেন।
ফ্লাইট বাড়ানোর দাবি
যাত্রীদের দাবি, রাজশাহী-ঢাকা রুটের বাস্তব যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ফ্লাইট সংখ্যা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নতুন এয়ারলাইন্সকে এই রুটে ফিরিয়ে আনা বা নতুন অপারেটর যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, শুধু ফ্লাইট বাড়ালেই হবে না—অনলাইন টিকিটের প্রাপ্যতা, ভাড়া নির্ধারণের স্বচ্ছতা এবং শেষ মুহূর্তের টিকিটের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অগ্রিম বুকিংয়ের সুযোগ আরও সহজ ও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
রাজশাহী-ঢাকা আকাশপথ উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য কেবল একটি পরিবহন রুট নয়; এর সঙ্গে চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, প্রশাসন ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। ফলে যাত্রী চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্লাইট ও আসনসংখ্যা না বাড়ালে রাজধানীর সঙ্গে রাজশাহীর দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে।
যাত্রীদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও এয়ারলাইন্সগুলো দ্রুত বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিয়ে এই সংকটের সমাধানে এগিয়ে আসবে।






