রাজশাহীতে নাবা ফার্মের মুরগির বর্জ্যে দূষণের অভিযোগ

খাল-বিল ও ফসলি জমিতে রাতের আঁধারে বর্জ্য ফেলার দাবি, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পরিবেশ অধিদপ্তরের
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় নাবিল গ্রুপের মালিকানাধীন নাবা ফার্মের পোল্ট্রি খামারের মুরগির বিষ্ঠা ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, গভীর রাতে ট্রাকে করে এসব বর্জ্য গোদাগাড়ী, মোহনপুর, তানোর, পবা, দুর্গাপুর ও নাচোলসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে গিয়ে ফেলা হচ্ছে। এতে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি পুকুর, খাল-বিল ও ফসলি জমির পানি দূষিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গোদাগাড়ী উপজেলার কাঁকনহাট এলাকার নাবা ফার্ম থেকে উৎপন্ন মুরগির লিটার ও অন্যান্য বর্জ্য রাতের আঁধারে ট্রাকে করে বিভিন্ন এলাকায় নেওয়া হয়। বিশেষ করে রাত ১২টা থেকে ভোররাত ৩টার মধ্যে এসব বর্জ্য ফেলার ঘটনা ঘটছে বলে তারা দাবি করেছেন।
গোদাগাড়ী উপজেলার গোমা গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাঁকনহাটের ঝিকড়াপাড়া এলাকা থেকে নাবা ফার্মের মুরগির লিটার ট্রাকে করে বিভিন্ন খাল-বিল ও ফসলি জমিতে ফেলা হচ্ছে। এতে এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি পানি দূষিত হওয়ায় কৃষিকাজ ও গবাদিপশুর ব্যবহারের জন্যও পানি ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি তাদের।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বর্জ্যের কারণে পুকুরের মাছ মারা যাচ্ছে এবং ফসলি জমিতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কোনো কোনো এলাকায় পুকুরের পানি সেচ, রান্না ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না বলেও জানিয়েছেন তারা।
এদিকে পবা ও দুর্গাপুর উপজেলার মধ্যবর্তী ফলিয়ার বিল এলাকাতেও গভীর রাতে ট্রাকে করে মুরগির বিষ্ঠা ফেলার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মুরগির খামার থেকে সংগ্রহ করা বর্জ্য রাতের আঁধারে বিলসংলগ্ন এলাকায় ফেলে রাখা হচ্ছে।
রাজশাহী থেকে মোহনগঞ্জগামী সড়কের পাশে ফলিয়ার বিল এলাকায় খোলা জায়গায় এসব বর্জ্য স্তূপ করে রাখায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী ও ওই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া রাজশাহী সিটি হাটের পাশের একটি ড্রেনের ওপর এবং কলার টিকর এলাকাতেও মুরগির বিষ্ঠা ফেলে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পরিবেশ দূষণ বন্ধে ব্যবস্থা চেয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়েও লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। গত ১০ মে দেওয়া ওই অভিযোগে বলা হয়, গোদাগাড়ী উপজেলার ১ নম্বর গোদাগাড়ী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের গোমা গ্রামের বিভিন্ন খাল-বিল ও এলাকায় রাতের আঁধারে নাবা ফার্মের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এতে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি পানি দূষিত হয়ে পরিবেশ ও জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বর্জ্যবাহী গাড়ি আটকানোর চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্থানীয়দের ভয়ভীতি দেখানো এবং প্রাণনাশের হুমকিও দিয়েছেন।
এদিকে বাধাইড় ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আসগার আলীও নাবিল গ্রুপের বর্জ্য ফেলার বিষয়ে রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগ দেওয়ার পরও এখন পর্যন্ত কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে দাবি অভিযোগকারীদের।
নাবা ফার্মের বিরুদ্ধে এর আগেও পরিবেশ দূষণের অভিযোগে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গত জুলাই মাসে গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিবেশ দূষণের দায়ে নাবা ফার্মকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেন। একই ঘটনায় ফার্মের কর্মচারী নাঈমকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল বলেও জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই ঘটনার পর কিছুদিন বর্জ্য ফেলা বন্ধ থাকলেও বর্তমানে আবারও বিভিন্ন এলাকায় মুরগির বিষ্ঠা ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।
স্থানীয়দের আরও দাবি, নাবা ফার্মের বর্জ্য অপসারণের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারদের মাধ্যমে এসব বর্জ্য বিভিন্ন এলাকায় ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়ে গোদাগাড়ীর কাঁকনহাট কাদিপুর এলাকার হাদিসুজ্জামানের ছেলে শাহ জামাল এবং ঝিকড়াপাড়া গ্রামের আনিসুর রহমানের ছেলে বাবুল সরকারের নাম স্থানীয়দের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে নাবিল গ্রুপের উপপরিচালক মামুনুর রশিদ বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বাবলুর সঙ্গে কথা বলতে। পরে নাবা ফার্মের মহাব্যবস্থাপক বাবলুর সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন বলেন, বিষয়টি নতুন করে তদন্ত করা হবে। দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু জরিমানা বা সাময়িক ব্যবস্থা নয়, পোল্ট্রি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী ও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কোথায়, কীভাবে এবং কার অনুমতিতে এসব বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।






