আকাশ থেকে দমন অভিযান: র্যাবের হেলিকপ্টারে এসএমজি-শটগান

আকাশ থেকে অস্ত্রের ব্যবহার। ৩ দিনে ছোড়া হয় ১,৫৪২ রাউন্ড গোলাবারুদ, সাউন্ড গ্রেনেড ও গ্যাসশেলে ছত্রভঙ্গ বিক্ষোভকারীরা; ধানমন্ডিতে গুলিতে নিহত নাসিমা, তদন্তে বেরিয়ে আসছে হেলিকপ্টার অভিযানের বিস্তারিত।
টুইট ডেস্ক: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চরম মুহূর্তে র্যাবের হেলিকপ্টার আকাশ থেকে আন্দোলনকারীদের দমনে ব্যবহার করা হয়েছে এসএমজি (সাবমেশিন গান), শটগান ও গ্যাসগান। এসব অস্ত্রের সঙ্গে প্রচুর গোলাবারুদ ও সাউন্ড গ্রেনেডও বহন করা হয়। হেলিকপ্টার থেকে গ্যাসগান ও সাউন্দ গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার ঘটনা ঘটেছে।
২০২৪ সালের ১৯, ২০ ও ২১ জুলাই—এই তিন দিন রাজধানীর আকাশে র্যাবের হেলিকপ্টারে তোলা হয় এসব আগ্নেয়াস্ত্র। মোট ৩ হাজার ৫৫৫টি গোলাবারুদ তোলা হয়েছিল হেলিকপ্টারে, যার মধ্যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয় ১ হাজার ৫৪২টি।
দিনভিত্তিক অস্ত্র ও গোলাবারুদের হিসাব
১৯ জুলাই: র্যাবের হেলিকপ্টারে তোলা হয় ১৩টি শটগান, ১৩টি গ্যাসগান ও ৪টি এসএমজি। সাউন্ড গ্রেনেড ছিল ৩৪০টি। গোলাবারুদের মধ্যে শটগানের জন্য ২৬০টি, গ্যাসগানের জন্য ৫৫৮টি ও এসএমজির জন্য ২৪০টি তোলা হয়। ওই দিন গ্যাসগান থেকে ২১৮টি গোলাবারুদ এবং ১২২টি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়।
২০ জুলাই: চারটি শটগান, ৯টি গ্যাসগান ও একটি এসএমজি তোলা হয়। সাউন্ড গ্রেনেড ২০০টি। গোলাবারুদের মধ্যে শটগানের জন্য ৮০টি, গ্যাসগানের জন্য ৬৮৪টি ও এসএমজির জন্য ৬০টি। গ্যাসগান থেকে ছোড়া হয় ৫১২টি গোলাবারুদ এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয় ১৫২টি।
২১ জুলাই: একটি শটগান, ৮টি গ্যাসগান ও একটি এসএমজি হেলিকপ্টারে ছিল। সাউন্ড গ্রেনেড তোলা হয় ৪০০টি। শটগানের জন্য ২০টি, গ্যাসগানের জন্য ৬৫৩টি ও এসএমজির জন্য ৬০টি গোলাবারুদ। ওই দিন গ্যাসগান থেকে ২৫৫টি গোলাবারুদ ও ২৮৩টি সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়।
সেনাবাহিনী ও র্যাবের সমঝোতায় ১৮ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ঢাকার চারপাশে হেলিকপ্টার উড়ানো হয়। বিশেষ করে ১৯ থেকে ২১ জুলাই অস্ত্রসহ হেলিকপ্টার উড়ে বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন দমন করা হয়। রামপুরা, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর, সাতমসজিদ রোড, চাঁন মিয়া হাউজিং, মহাখালী, মিরপুর-১০, যাত্রাবাড়ী, রায়েরবাগ, উত্তরা ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয়। কোনো কোনো এলাকায় খুব নিচু দিয়ে উড়ে গুলির শব্দও শোনা যায়।
ধানমন্ডির ঘটনা
১৯ জুলাই ধানমন্ডি ১ নম্বরের একটি বাসার ছাদে উঠে গুলিবিদ্ধ হন রেহেনা আক্তারের ছেলে আইমান উদ্দিন (২৪) ও ননদ নাসিমা আক্তার (২৪)। আইমানের বুকের ডান পাশে গুলি লেগে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। নাসিমাও গুলিবিদ্ধ হন। পরদিন ২০ জুলাই নাসিমা মারা যান। আইমান চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠলেও মাঝেমধ্যে শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা অনুভব করেন। ঘটনার সময় হেলিকপ্টার উড়তে দেখা গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন রেহেনা আক্তার।
বিশেষজ্ঞরা জানান, শটগান থেকে রাবার বুলেট বা সিসার গুলি ছোড়া হয়। গ্যাসগান থেকে কাঁদানে গ্যাসের শেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড দিয়ে প্রচণ্ড শব্দ সৃষ্টি করা হয়। এগুলো সাধারণত প্রাণঘাতী নয়। তবে এসএমজি দিয়ে লাইভ বুলেট ছোড়া হয়, যা প্রাণঘাতী। ১,৫৪২ রাউন্ড গোলাবারুদ বলা হলেও বহুগুন বেশী ব্যবহার হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা মনে করেন।
র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্তাধীন বিষয় হওয়ায় বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে, সেগুলোর উত্তর দেওয়া হয়েছে। হেলিকপ্টারে কারা দায়িত্বে ছিলেন, তা মোবাইল ফোনের বিটিএস টাওয়ার ও আইএমইআই নম্বরের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ওই সময় ২০ জনের বেশি ব্যক্তি পর্যায়ক্রমে হেলিকপ্টারে দায়িত্ব পালন করেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দমন-পীড়নের ঘটনা তদন্ত চলছে।
সূত্র: প্রথম আলো






