দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা-ভূমিধসে তীব্র সংকট: বান্দরবানে লাখো মানুষ পানিবন্দি

১ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি, ৭ জেলায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি—চলছে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম। পাহাড় ধস ও বন্যায় বাড়ছে মৃত্যু, আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো মানুষের ভিড়।
বান্দরবান প্রতিনিধি: দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চলমান টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা ও ভূমিধসের তীব্রতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে বান্দরবান জেলায় পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং ২৯টি ইউনিয়নের শত শত গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, পাহাড় ধস ও পানিতে ভেসে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। দেশব্যাপী এ দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ৪৪ থেকে ৫১ জনের মধ্যে পৌঁছেছে এবং ১০ লক্ষাধিক মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামসহ অন্তত ৭টি জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
মধ্যরাতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে ১৪০ জনকে উদ্ধার
এ দুর্যোগের মধ্যেই মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বান্দরবান জেলা প্রশাসন। সাংগু নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে শহরের ওয়াদ্দা ব্রিজ এলাকার একটি নির্মাণাধীন ঝুঁকিপূর্ণ ৬ তলা ভবনে আশ্রয় নেওয়া ১৪০ জন বন্যাদুর্গতকে মধ্যরাতে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ভবনটিতে দেয়াল, রেলিং, বিদ্যুৎ ও টয়লেট সুবিধা না থাকায় সেখানে অবস্থানরত আর্মিপাড়া ও শেরেবাংলা নগর এলাকার মানুষ চরম ঝুঁকিতে ছিলেন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলা প্রশাসন তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে এবং রাত ১টার মধ্যে সবাইকে বাসস্টেশন সংলগ্ন ওয়ার্ল্ড ভিশন আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করে।
প্রশাসকের সরাসরি তত্ত্বাবধান ও সহায়তা
উদ্ধার কার্যক্রম শেষে জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস নিজে আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। তিনি বন্যাদুর্গতদের খোঁজখবর নেন এবং নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করেন। তিনি জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসাসহ সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এস. এম. হাসান, সজীব কান্তি রুদ্রসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং ওয়ার্ল্ড ভিশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার
দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় নৌযান ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার এবং খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে বান্দরবানে ২২০টির বেশি আশ্রয়কেন্দ্রে ৬ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
ত্রাণ সহায়তা ও জরুরি যোগাযোগ
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বন্যার্তদের মাঝে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা নগদ অনুদান বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান অব্যাহত রয়েছে।
দুর্যোগকালীন সহায়তার জন্য নিম্নোক্ত নম্বরে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে—
জেলা প্রশাসন: ০১৩০৯৭৪৪৯২৩
জেলা পুলিশ: ০১৩২০-১০৮৯৮
মানবিক সহায়তার আহ্বান
মধ্যরাতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে ১৪০ জনকে উদ্ধার এবং প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সহায়তা প্রদান জনসেবার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। বান্দরবানসহ বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
এ অবস্থায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের সকল স্তরের মানুষকে বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।







