গোলের রাজপুত্র আর্জেন্টিনার বাতিস্তুতা

ড্রিবলিংয়ের জাদু নয়, দুর্দান্ত ফিনিশিং আর অদম্য মানসিকতায় ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন ‘বাতিগোল’

টুইট প্রতিবেদক: ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু স্ট্রাইকার আছেন, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই গোলের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি গ্যাব্রিয়েল ওমর বাতিস্তুতা সেই বিরল তালিকার অন্যতম। অসাধারণ ড্রিবলিং বা চমকপ্রদ কারিকুরি নয়, পেনাল্টি এলাকার ভেতর ও আশপাশে নিখুঁত অবস্থান, শক্তিশালী শট, দুর্দান্ত হেড এবং নির্ভুল ফিনিশিংয়ের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলদাতার মর্যাদায়। এ কারণেই ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তিনি আজও পরিচিত ‘বাতিগোল’ নামে।

১৯৬৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া বাতিস্তুতার শৈশবের স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। বাস্কেটবল ছিল তার প্রথম ভালোবাসা। তবে ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় এবং পরবর্তী সময়ে দিয়েগো ম্যারাডোনার উত্থান তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। এরপর ফুটবলই হয়ে ওঠে তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য।

দেশের দুই ঐতিহ্যবাহী ক্লাব বোকা জুনিয়র্স ও রিভার প্লেটে খেললেও তার ক্যারিয়ারের প্রকৃত উত্থান ঘটে ১৯৯১ সালে ইতালির ফিওরেন্টিনায় যোগ দেওয়ার পর। নব্বইয়ের দশকে ইতালীয় ফুটবল ছিল বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসর। কঠোর রক্ষণভাগের বিপক্ষে নিয়মিত গোল করে বাতিস্তুতা নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।

ফিওরেন্টিনার প্রতি তার আনুগত্য আজও ফুটবল ইতিহাসে অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৯৩ সালে ক্লাবটি দ্বিতীয় বিভাগে নেমে গেলেও তিনি বড় ক্লাবের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। বরং দলটির সঙ্গেই থেকে আবার সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফিরিয়ে আনেন। এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ফ্লোরেন্স শহরে তার ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়।

ক্যারিয়ারের শেষভাগে শিরোপার খোঁজে তিনি এএস রোমায় যোগ দেন। ২০০০-০১ মৌসুমে তার অসাধারণ পারফরম্যান্সে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ইতালিয়ান লিগের শিরোপা জেতে রোমা।

জাতীয় দলের জার্সিতেও বাতিস্তুতা ছিলেন সমান উজ্জ্বল। আর্জেন্টিনার হয়ে ৭৮ ম্যাচে ৫৪ গোল করে দীর্ঘদিন দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের দখলে রাখেন। পরে সেই রেকর্ড ভেঙে দেন লিওনেল মেসি। এছাড়া ১৯৯১ ও ১৯৯৩ সালে টানা দুটি কোপা আমেরিকা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

বিশ্বকাপ ইতিহাসেও বাতিস্তুতার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা। ১৯৯৪ ও ১৯৯৮—দুটি পৃথক বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করার বিরল কীর্তি এখনো একমাত্র তারই দখলে। ২০০২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হতাশাজনক বিদায়ের পর ডাগআউটে তার অশ্রুসিক্ত মুখ ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে স্থায়ী স্মৃতি হয়ে আছে।

বর্তমান যুগে কৌশলগত পরিবর্তনের কারণে খাঁটি ‘নম্বর নয়’ স্ট্রাইকারের সংখ্যা কমে এসেছে। তবু গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা প্রমাণ করে গেছেন, নিখুঁত গোল করার ক্ষমতাই একজন ফরোয়ার্ডকে কিংবদন্তির আসনে বসাতে পারে।

গোলের প্রতি অদম্য ক্ষুধা, ক্লাবের প্রতি আনুগত্য এবং বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করার সামর্থ্য তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।