১৩ থেকে ৪৮ দলে বিশ্বকাপ, ৯৬ বছরে ফুটবলের মহাবিবর্তন

১৯৩০ সালের ছোট্ট আয়োজন থেকে ২০২৬ সালের ৪৮ দলের মহাযজ্ঞ, বদলে গেছে বিশ্বকাপের প্রায় সবকিছু।

টুইট প্রতিবেদক: ফুটবল বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৩০ সালে উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিওতে। মাত্র ১৩টি দলকে নিয়ে শুরু হওয়া সেই প্রতিযোগিতা ২০২৬ সালে এসে পরিণত হয়েছে ৪৮ দলের বৈশ্বিক মহাযজ্ঞে। প্রায় ৯৬ বছরের এই পথচলায় বদলে গেছে আয়োজনের পরিধি, প্রযুক্তি, ভ্রমণব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং প্রতিযোগিতার বৈশ্বিক চরিত্র।

১৩ দল থেকে ৪৮ দলের বিস্তার

প্রথম বিশ্বকাপে কোনো বাছাইপর্ব ছিল না। ফিফার আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে অংশ নিয়েছিল ১৩টি দেশ। চারটি গ্রুপে বিভক্ত সেই আসরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল মাত্র ১৭টি ম্যাচ।

অন্যদিকে ২০২৬ বিশ্বকাপে দীর্ঘ বাছাইপর্ব পেরিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছে ৪৮টি দল। দলগুলোকে ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছে শেষ ৩২ পর্ব। ফলে মোট ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪টি।

এক শহর থেকে তিন দেশের আয়োজন

১৯৩০ সালের পুরো বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল উরুগুয়ের মন্টেভিডিও শহরের মাত্র তিনটি স্টেডিয়ামে।

অন্যদিকে ২০২৬ বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা। উত্তর আমেরিকার তিন দেশের ১৬টি আধুনিক স্টেডিয়ামে ছড়িয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল প্রতিযোগিতা।

জাহাজযাত্রা থেকে চার্টার্ড উড়োজাহাজ

প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিতে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়ার মতো ইউরোপীয় দলগুলোকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ জাহাজে ভ্রমণ করতে হয়েছিল।

বর্তমান বিশ্বকাপে সেই দৃশ্য সম্পূর্ণ বদলে গেছে। দলগুলো চার্টার্ড উড়োজাহাজে অল্প সময়েই এক ভেন্যু থেকে অন্য ভেন্যুতে পৌঁছে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ম্যাচ পরিচালনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

প্রযুক্তির যুগে ফুটবল

১৯৩০ সালে ভিডিও সহায়তা, উন্নত সম্প্রচার কিংবা আধুনিক বিশ্লেষণ প্রযুক্তির কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

২০২৬ বিশ্বকাপে রেফারিংয়ের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে ভিডিও সহকারী রেফারি (ভিএআর), আধা-স্বয়ংক্রিয় অফসাইড প্রযুক্তি এবং চিপসংযুক্ত স্মার্ট বল। ফলে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বল ও মাঠের আমূল পরিবর্তন

প্রথম বিশ্বকাপে ব্যবহৃত চামড়ার বল বৃষ্টির পানি শুষে ভারী হয়ে যেত। মাঠও ছিল প্রাকৃতিক ঘাসনির্ভর এবং তুলনামূলক অনুন্নত।

বর্তমানে উন্নত বায়ুগতিবিদ্যাভিত্তিক বল, হাইব্রিড ঘাস এবং আধুনিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়াম খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা থেকে বৈশ্বিক উৎসব

১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ মূলত ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ ছিল। সেই আসরে উরুগুয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মর্যাদা অর্জন করে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে। ২০২৬ বিশ্বকাপে এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ওশেনিয়ার দলগুলোর ব্যাপক অংশগ্রহণ বিশ্বকাপকে সত্যিকারের বৈশ্বিক ক্রীড়া উৎসবে পরিণত করেছে।

৯৬ বছরের এই বিবর্তন শুধু অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যাই বাড়ায়নি; বদলে দিয়েছে বিশ্বকাপের প্রতিটি দিক। ১৩ দলের সীমিত আয়োজন আজ ৪৮ দলের সর্বজনীন ফুটবল মহোৎসবে রূপ নিয়েছে, যা বিশ্ব ফুটবলের বিস্তার ও আধুনিকায়নের সবচেয়ে বড় প্রতীক।