ম্যারাডোনা: ফুটবলের জাদুকর, প্রতিবাদের প্রতীক

বিশ্বকাপের মহাকাব্যিক নায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনা শুধু মাঠেই নয়, রাজনীতি, সমাজ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানের কারণেও হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।
টুইট প্রতিবেদক: দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নাম। আর্জেন্টিনার এই কিংবদন্তি তার অসাধারণ দক্ষতা, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আজও বিশ্বজুড়ে আলোচিত। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তিনি যেমন ‘ফুটবল-ঈশ্বর’, তেমনি নিপীড়িত মানুষের অধিকারের প্রশ্নে ছিলেন সোচ্চার এক কণ্ঠস্বর।
১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর আর্জেন্টিনার লানুস এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন ম্যারাডোনা। রাজধানী বুয়েনস আইরেসের দরিদ্র উপকণ্ঠে বেড়ে ওঠা এই প্রতিভা অল্প বয়সেই ফুটবল বিশ্বের নজর কাড়েন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার শীর্ষ লিগে অভিষেক হয় তার। এরপর আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের হয়ে পাঁচ মৌসুমে ১৬৭ ম্যাচে ১১৫ গোল করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন দেশের অন্যতম সেরা তরুণ ফুটবলার হিসেবে।
জাতীয় দলের জার্সিতেও খুব দ্রুত জায়গা করে নেন ম্যারাডোনা। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক ঘটে তার। আর্জেন্টিনার হয়ে ৯১ ম্যাচে ৩৪ গোল করা এই তারকা পরবর্তীতে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ে পরিণত হন।
১৯৮৬: ম্যারাডোনার বিশ্বজয়
মেক্সিকো বিশ্বকাপই ম্যারাডোনাকে অমরত্ব দেয়। পুরো আসরে পাঁচ গোল ও পাঁচটি গোল তৈরির মাধ্যমে তিনি একাই প্রায় আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দেন। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তার দুটি গোল ফুটবল ইতিহাসে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছে।
প্রথম গোলটি ‘ঈশ্বরের হাত’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। রিপ্লেতে দেখা যায়, তিনি হাত ব্যবহার করে বল জালে পাঠিয়েছিলেন। পরে নিজেই মন্তব্য করেছিলেন, গোলটি হয়েছিল “কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।”
তবে একই ম্যাচে করা তার দ্বিতীয় গোলটি ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে কয়েকজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোলরক্ষককে পরাস্ত করে করা সেই গোলকে পরবর্তীতে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা গোল হিসেবে নির্বাচন করা হয়।
সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে দুই গোল এবং ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে জয়সূচক গোলের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আর্জেন্টিনাকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেন তিনি।
ক্লাব ফুটবলে স্বর্ণযুগ
১৯৮২ সালে সে সময়ের রেকর্ড ৫০ লাখ পাউন্ডে স্পেনের বার্সেলোনায় যোগ দেন ম্যারাডোনা। যদিও চোট ও নানা সমস্যার কারণে সেখানে তার সময়টা খুব সুখকর ছিল না।
পরবর্তীতে ইতালির নাপোলিতে যোগ দিয়ে তিনি ইতিহাস গড়েন। তার নেতৃত্বে নাপোলি প্রথমবারের মতো ইতালিয়ান লিগ জেতে এবং ইউরোপীয় প্রতিযোগিতাতেও সাফল্য অর্জন করে। নাপোলিকে বিশ্ব ফুটবলের শক্তিশালী ক্লাবে পরিণত করার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ম্যারাডোনার। তার সম্মানে ক্লাবটি পরবর্তীতে ১০ নম্বর জার্সি অবসরে পাঠায়।
বিতর্ক, আসক্তি ও পতন
মাঠের জাদুকর হলেও ব্যক্তিগত জীবনে নানা বিতর্কে জড়িয়েছেন ম্যারাডোনা। মাদকাসক্তি দীর্ঘদিন তার জীবনকে প্রভাবিত করেছে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ ওষুধ গ্রহণের দায়ে তাকে বহিষ্কার করা হয়, যা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি।
অতিরিক্ত ওজন, স্বাস্থ্যগত জটিলতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন তার শারীরিক অবস্থাকে দুর্বল করে তোলে। জীবনের শেষ দিকে একাধিক অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাকে।
মাঠের বাইরের বিপ্লবী
ম্যারাডোনা শুধু ফুটবলার ছিলেন না, ছিলেন রাজনৈতিক ও সামাজিক বক্তব্যেরও শক্তিশালী মুখ। তিনি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং গাজায় সামরিক হামলার সমালোচনা করেছিলেন।
কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। নিজের শরীরে ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার প্রতিকৃতি উল্কি আঁকিয়ে তিনি সেই রাজনৈতিক বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটান। যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও তিনি সরব ছিলেন। ভেনেজুয়েলার সাবেক রাষ্ট্রপতি হুগো শাভেজের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক ছিল।
অমর এক উত্তরাধিকার
২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর হৃদ্রোগজনিত জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেন ম্যারাডোনা। তার মৃত্যু নিয়ে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগে এখনও আইনি প্রক্রিয়া চলছে। তবে মৃত্যুর পরও ফুটবল ইতিহাসে তার প্রভাব অমলিন।
দিয়েগো ম্যারাডোনা ছিলেন বৈপরীত্যের এক বিস্ময়কর সমন্বয়,একদিকে অসাধারণ প্রতিভাবান ফুটবলার, অন্যদিকে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব; একদিকে বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক, অন্যদিকে প্রতিবাদী রাজনৈতিক কণ্ঠ। মাঠের জাদুকর হিসেবে তিনি যেমন কিংবদন্তি, তেমনি নিপীড়নের বিরুদ্ধে উচ্চারিত কণ্ঠস্বর হিসেবেও তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।






