প্রজেক্ট এমবাপে’ বদলে দিয়েছে এক অহংকারী কিশোরকে

প্রতিভা, শৃঙ্খলা ও পরিবারের পরিকল্পনায় কিলিয়ান এমবাপে এখন ফ্রান্স ফুটবলের নতুন ইতিহাসের পথে

টুইট প্রতিবেদক: ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসে একের পর এক কিংবদন্তি আক্রমণভাগের খেলোয়াড় এলেও গোলের সংখ্যায় সবাইকে পেছনে ফেলে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন কিলিয়ান এমবাপে। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই ‘লে ব্লুজ’দের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেছেন এই রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড।

সেনেগালের বিপক্ষে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ উদ্বোধনী ম্যাচে গোল করে এমবাপে ছাড়িয়ে যান অলিভিয়ের জিরুকে। জাতীয় দলের হয়ে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৫৮-তে। মাত্র ৯৯ ম্যাচেই এই মাইলফলক ছুঁয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, কেন তাকে ফরাসি ফুটবলের ভবিষ্যতের সর্বশ্রেষ্ঠ তারকা বলা হচ্ছে।

জিরু নিজেও এমবাপের প্রশংসা করে বলেছেন, তার সামনে আরও অনেক রেকর্ড ভাঙার সুযোগ রয়েছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১৪ গোল করা এমবাপে এখন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ডের কাছাকাছি।

গোলের বাইরে নেতৃত্বের প্রতীক

ফরাসি ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এমবাপের বিশেষত্ব শুধু তার গোল করার ক্ষমতায় নয়; মাঠে নেতৃত্ব, বড় ম্যাচে দায়িত্ব নেওয়া এবং চাপ সামলানোর দক্ষতাও তাকে আলাদা করেছে।

২০১৮ সালের বিশ্বকাপে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। ওই আসরে তিনি বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করা পেলের পর দ্বিতীয় কিশোর ফুটবলার হন।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আরও বড় ভূমিকা রাখেন এমবাপে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে হ্যাটট্রিক করে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে বিরল কীর্তি গড়েন।

জন্ম হয়েছিল ‘প্রজেক্ট এমবাপে’র

এমবাপের এই উত্থানের পেছনে ছিল দীর্ঘ পরিকল্পনা। ছোটবেলা থেকেই তার পরিবার বিশ্বাস করত, সঠিক পরিচর্যা পেলে তিনি বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে পৌঁছাতে পারবেন। এই পরিকল্পনাই পরিচিতি পায় ‘প্রজেক্ট এমবাপে’ নামে।

১৯৯৮ সালে প্যারিসের উপকণ্ঠ বন্ডিতে জন্ম নেওয়া এমবাপের শৈশব কেটেছে ফুটবল ঘিরে। তার বাবা উইলফ্রেড ছিলেন কোচ, আর মা ফায়জা লামারি ছিলেন পেশাদার হ্যান্ডবল খেলোয়াড়।

ছোটবেলা থেকেই এমবাপের লক্ষ্য ছিল সেরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলা। মাত্র তিন বছর বয়সে ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত মুখস্থ করা থেকে শুরু করে কৈশোরে বড় ক্লাবগুলোর নজরে আসা—সবকিছুতেই দেখা গেছে তার ব্যতিক্রমী মানসিকতা।

অহংকার থেকে আত্মবিশ্বাস, কিশোর থেকে নেতা

কৈশোরে এমবাপের মধ্যে প্রবল আত্মবিশ্বাস ছিল। মোনাকোর বয়সভিত্তিক দলে থাকার সময় একটি কাজে তাকে নিজের ছবি দিয়ে একটি সাময়িকীর প্রচ্ছদ বানাতে বলা হয়েছিল। অন্যরা সাধারণ ক্রীড়া সাময়িকী বেছে নিলেও এমবাপে বেছে নিয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত ‘টাইম’ সাময়িকী। তার শিরোনাম ছিল,‘ওস্তাদ’।

চার বছর পর সেই স্বপ্নই বাস্তব হয়। ২০১৮ বিশ্বকাপ জয়ের পর সত্যিই বিশ্বমঞ্চের প্রচ্ছদে জায়গা করে নেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাফল্যের সঙ্গে আসা অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করে এমবাপে ধীরে ধীরে একজন পরিণত নেতা হয়ে উঠেছেন। ২০২৩ সালে ফ্রান্স জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পান তিনি।

সামনে আরও বড় ইতিহাসের হাতছানি

এখনো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বা ব্যালন ডি’অর জেতা হয়নি এমবাপের। তবে তার বয়স, পরিসংখ্যান এবং ধারাবাহিকতা বলছে,ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে তিনি ফ্রান্সের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের তালিকার শীর্ষে উঠে আসতে পারেন।

‘প্রজেক্ট এমবাপে’ তাই এখনো শেষ হয়নি; বরং বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে নিজের নাম আরও বড় করে লেখার পথে এগিয়ে চলেছেন কিলিয়ান এমবাপে।