বাংলাদেশে এসে কেঁদেছিলেন শাকিরা

সিডরের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে আবেগাপ্লুত হন বিশ্বখ্যাত পপ তারকা, শিশুদের স্বপ্নে খুঁজে পেয়েছিলেন আশার আলো
টুইট ডেস্ক: বিশ্বকাপের উন্মাদনায় আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে কলম্বিয়ার বিশ্বখ্যাত পপ তারকা Shakira। ‘ওয়াকা ওয়াকা’ ও ‘লা লা লা’র মতো বিশ্বকাপের জনপ্রিয় সংগীতের জন্য পরিচিত এই শিল্পীর সঙ্গে বাংলাদেশের একটি আবেগঘন স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর তিনি নীরবে বাংলাদেশ সফরে এসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে বাংলাদেশ সফর
২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘের শিশু তহবিল UNICEF–এর বৈশ্বিক শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন শাকিরা। সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত শিশু ও পরিবারের অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করা এবং আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
ঢাকায় পৌঁছানোর পর তিনি দ্রুত দক্ষিণাঞ্চলের দুর্গত এলাকায় যান। পটুয়াখালীর ক্ষতিগ্রস্ত জনপদ ঘুরে দেখেন, শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান এবং তাদের জীবনের বাস্তবতা কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেন।
নিপার গান শুনে আবেগাপ্লুত
সফরের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত ছিল সিডরে মা–বাবাকে হারানো ১১ বছর বয়সী এক শিশু নিপার সঙ্গে সাক্ষাৎ। নিপা শাকিরাকে একটি শোকের গান শোনায়, যার অর্থ ছিল—‘মা, তুমি যেখানেই থাকো, আমাকে একটি চিঠি লিখো।’
পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শাকিরা বলেন, সেই শিশুর কণ্ঠ ও বেদনার কথা তিনি কখনও ভুলতে পারবেন না। দুর্যোগের ভয়াবহতার মধ্যেও শিশুদের স্বপ্ন, হাসি ও জীবনীশক্তি তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও আশার আলো
সিডর বিধ্বস্ত এলাকায় গিয়ে শাকিরা দেখেছিলেন অসংখ্য পরিবার তাদের ঘরবাড়ি, সম্পদ ও প্রিয়জন হারিয়েছে। পুরো গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার দৃশ্য তাকে মানসিকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
তবে একই সঙ্গে তিনি দেখেছিলেন আধা-ধ্বংসপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ে শিশুদের খেলাধুলা, গান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার দৃশ্য। ডাক্তার ও নার্স হওয়ার স্বপ্নের কথা শুনে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। তার মতে, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও শিশুদের ইতিবাচক মনোভাব ছিল অনুপ্রেরণাদায়ক।
শিশুদের জন্য কাজ করার প্রেরণা
শিশুদের প্রতি শাকিরার দায়বদ্ধতার শুরু শৈশব থেকেই। আট বছর বয়সে নিজের দেশের দরিদ্র শিশুদের জীবনযাপন দেখে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন। পরবর্তীতে ১৮ বছর বয়সে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Pies Descalzos Foundation, যা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও উন্নয়নে কাজ করে।
বাংলাদেশ সফরকালে তিনি রাজশাহীতেও ইউনিসেফের একটি প্রকল্প পরিদর্শন করেন এবং শিশুদের জন্য পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচি সম্পর্কে ধারণা নেন।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান
বাংলাদেশ সফর শেষে শাকিরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের শিশু ও দুর্যোগপীড়িত মানুষের জন্য আরও বেশি সহায়তা প্রয়োজন। সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই তাদের জীবন পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বকাপের তারকা, মানবতারও কণ্ঠস্বর
আজ বিশ্বকাপের গান ও মঞ্চ মাতানো পরিবেশনার জন্য শাকিরা বিশ্বজুড়ে আলোচিত। তবে প্রায় দুই দশক আগে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে দুর্যোগকবলিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের গল্প শোনা এবং তাদের সঙ্গে কাঁদার ঘটনাও তার মানবিক পরিচয়ের উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রয়েছে।
বিশ্বমঞ্চের এই তারকা শুধু সংগীত দিয়েই নয়, মানবিক দায়িত্ববোধ ও শিশুদের প্রতি অঙ্গীকারের মাধ্যমেও কোটি মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন।






