ফুলের রঙে রাঙা রাজশাহী, তাপদাহেও মিলছে প্রশান্তির ছোঁয়া

নগরজুড়ে কৃষ্ণচূড়া-সোনালু-জারুলের সৌন্দর্য, সবুজায়নে কমছে তাপদাহের প্রভাবও
নিজস্ব প্রতিবেদক: উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ জনপদ রাজশাহী। গ্রীষ্ম এলেই এখানে তাপমাত্রার পারদ বাড়তে থাকে, প্রকৃতি হয়ে ওঠে রুক্ষ ও শুষ্ক। তবে তীব্র তাপদাহ আর খরার মধ্যেও এ সময় রাজশাহী মহানগর যেন নতুন এক রূপে সেজে ওঠে। নগরজুড়ে ফুটে থাকা বাহারি ফুলের সমারোহ গরমের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছে নগরবাসীকে।
মহানগরীর প্রধান সড়ক, সংযোগপথ, আবাসিক এলাকা ও সড়ক বিভাজকজুড়ে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, সোনালু, জারুল, কাঠগোলাপ, জ্যাকারেন্ডা, বাগানবিলাস, অলকানন্দা, রঙ্গন, দোলনচাঁপা, টগর ও কলাবতীর বর্ণিল উপস্থিতি নগরীর সৌন্দর্যে এনে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা।
রঙিন করিডোরে পরিণত রাজপথ
গ্রীষ্মের এই সময়ে রাজশাহীর বিভিন্ন সড়ক যেন রঙিন করিডোরে রূপ নিয়েছে। কোথাও কৃষ্ণচূড়ার অগ্নিরঙা ছাউনি, কোথাও সোনালুর ঝুলন্ত সোনালি থোকা, আবার কোথাও জারুলের বেগুনি আভা পথচারীদের মুগ্ধ করছে।
বিশেষ করে ফিরোজাবাদ থেকে চৌদ্দপাই পর্যন্ত চার লেন সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধ কৃষ্ণচূড়া, সোনালু ও জারুলের সমারোহ সৃষ্টি করেছে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। ছোটবনগ্রাম এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, প্রচণ্ড রোদেও এসব ফুল চোখে এনে দেয় এক ধরনের শীতলতা ও প্রশান্তি।
নগরীর ভদ্রা থেকে তালাইমারি সড়কের বিভাজকে শোভা পাচ্ছে বাগানবিলাস, অলকানন্দা ও কলাবতী। তালাইমারি থেকে আলুপট্টি সড়কে সুগন্ধ ছড়াচ্ছে দোলনচাঁপা, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা ও চম্পা। অন্যদিকে কাশিয়াডাঙ্গা থেকে বহরমপুর সড়কে রঙ্গন, টগর ও গৌরিচোরার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে নগরীর নান্দনিকতা।
সৌন্দর্যের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও কার্যকর
পরিবেশবিদদের মতে, রাজশাহী দেশের অন্যতম তাপপ্রবণ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, পানির সংকট ও নগরায়নের চাপ মোকাবিলায় বৃক্ষ ও ফুলগাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এসব গাছ তাপ শোষণ করে নগরীর তাপমাত্রা কিছুটা কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা আটকে রেখে বায়ুর মান উন্নত করতেও কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, নগর এলাকায় গাছপালা ও সবুজায়ন ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপ প্রভাব কমাতে সহায়ক। কংক্রিটের স্থাপনা যেখানে তাপ ধরে রাখে, সেখানে গাছের ছায়া ও বাষ্পীভবন প্রক্রিয়া পরিবেশকে তুলনামূলক শীতল রাখে।
পরিকল্পিত সবুজায়নে বদলে গেছে নগরীর চিত্র
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন সড়কের পাশে ও সড়ক বিভাজকে প্রায় ১০ হাজার গাছ রোপণ করা হয়। এর বড় অংশই ছিল বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ।
সময়ের ব্যবধানে গাছগুলো এখন পূর্ণতা পেয়েছে এবং নগরবাসী উপভোগ করছেন তাদের সৌন্দর্য। পাশাপাশি সড়কজুড়ে আধুনিক এলইডি আলোকসজ্জা স্থাপন করায় রাতের রাজশাহীও হয়ে উঠেছে আরও আকর্ষণীয়।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক আরিফ হোসেন বলেন, “প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত হয়ে পড়লে রাস্তার পাশের গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই। ফুলে সাজানো সড়কগুলো মনেও প্রশান্তি এনে দেয়।”
কলেজ শিক্ষিকা নুরুন্নাহার খাতুন বলেন, “গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহে যখন চারপাশ বিবর্ণ হয়ে যায়, তখন নগরীর ফুলে সাজানো সড়কগুলো নতুন প্রাণের সঞ্চার করে।”
আইনজীবী রজব আলীর মতে, দ্রুত নগরায়নের এই সময়ে রাজশাহীর সড়কজুড়ে গড়ে ওঠা সবুজায়ন প্রকৃতি ও আধুনিক নগর পরিকল্পনার এক অনন্য উদাহরণ।
সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগর গড়ার উদ্যোগ
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার লক্ষ্যেই পরিকল্পিতভাবে ফুল ও ছায়াবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “এসব গাছ শুধু সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না, বরং নগরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বায়ুদূষণ কমানো এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।”
সাম্প্রতিক সময়ে ফুলে সাজানো এসব সড়ক স্থানীয়দের পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও আকৃষ্ট করছে। বিকেল হলেই বিভিন্ন এলাকায় ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমী, আলোকচিত্রী ও তরুণ-তরুণীরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও ধারণ করছেন, আবার কেউ পরিবার নিয়ে উপভোগ করছেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য।
তাপদাহের শহর রাজশাহী যেন আজ ফুলের রঙে খুঁজে পেয়েছে নতুন প্রাণ, নতুন প্রশান্তি।






