জাতীয় সরকারে ফাটল? বিএনপিকে ঘিরে বাড়ছে শরিকদের অসন্তোষ

প্রতিশ্রুত ‘জাতীয় সরকার’ নিয়ে প্রশ্ন, তিন মাসেই ‘একলা চলো’ আশঙ্কা
টুইট ডেস্ক: জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের পথ পাড়ি দিয়েছিল বিএনপি ও তাদের যুগপৎ শরিকরা। তবে সরকার গঠনের তিন মাস না যেতেই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন আন্দোলনের সঙ্গী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। তাদের অভিযোগ, আন্দোলনের সময় দেওয়া অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের অঙ্গীকার এখনো বাস্তব রূপ পায়নি; বরং সরকার পরিচালনায় বিএনপির একক আধিপত্যই স্পষ্ট হচ্ছে।
২০২২ সালের মার্চে লন্ডনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান বলেছিলেন, নির্বাচনে জয়ী-পরাজিত নির্বিশেষে গণতন্ত্রপন্থি শক্তিকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। চার বছর পর সেই বক্তব্য নতুন করে সামনে এনে প্রশ্ন তুলছেন শরিক নেতারা— প্রতিশ্রুত সেই জাতীয় সরকার কোথায়?
শরিকদের অভিযোগ, ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা এবং উপদেষ্টা মিলিয়ে মোট ৫৯ সদস্যের কাঠামো গঠন করা হলেও যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত সীমিত। আন্দোলনের অংশীদারদের মধ্যে মাত্র দুজনকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে ‘জাতীয় সরকার’ এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে বাস্তব কাঠামো পায়নি বলেই মনে করছেন তারা।
যুগপৎ আন্দোলনের অন্যতম শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, আন্দোলনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয়। তার মতে, বিএনপি হয়তো মনে করছে শরিকদের রাজনৈতিক সমর্থন অব্যাহত থাকবে। তবে রাজনীতিতে কোনো সমর্থনই শর্তহীন নয়।
তিনি আরও ইঙ্গিত করেন, সরকার গঠনের পর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ শরিকদের সঙ্গে বিএনপির কার্যকর রাজনৈতিক যোগাযোগ বা অংশগ্রহণমূলক সম্পর্ক তৈরি হয়নি। এতে দলগুলোর মধ্যে “একলা চলো” নীতির আশঙ্কা বাড়ছে।
শরিকদের আরেকটি বড় অভিযোগ, নির্বাচনের আগে কিছু আসন ছাড় দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরোধিতা কিংবা বিদ্রোহী প্রার্থীর মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। ফলে রাজনৈতিক ঝুঁকি ভাগাভাগি হলেও সরকারে অংশীদারিত্বে সেই প্রতিফলন দেখা যায়নি।
এদিকে কিছু নেতা মনে করছেন, আন্দোলনে অংশ নিয়ে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের প্রত্যাশা, আন্দোলনে অংশ নেওয়া এবং নির্বাচনে পরাজিত নেতাদেরও রাজনৈতিকভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
অন্যদিকে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন সৈয়দ এহসানুল হুদা। তার দাবি, বিএনপি জাতীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসেনি। যোগ্য প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচিতদের সরকারেও জায়গা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও ধাপে শরিকদের মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারক মহলের ভাষ্য, জাতীয় সরকার মানে সব দলকে সমসংখ্যক মন্ত্রণালয় দেওয়া নয়। বরং সরকার পরিচালনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করাই মূল উদ্দেশ্য। সময়ের সঙ্গে সেই সমন্বয় আরও বিস্তৃত হবে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, শরিকদের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনো হয়নি। নতুন সরকারের যাত্রা মাত্র তিন মাসের, তাই সময়ের সঙ্গে বিষয়গুলো বিবেচনায় আসবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনের শুরুর দিকেই যদি শরিকদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়, তবে ভবিষ্যতে তা রাজনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এখন দেখার বিষয়— প্রতিশ্রুত জাতীয় সরকার বাস্তব কাঠামো পায়, নাকি শরিকদের অসন্তোষ আরও গভীর হয়।






