মহান মে দিবস: ঘামে লেখা ইতিহাস, কবিতায় খুঁজে পাওয়া মেহনতি মুখ

নিজস্ব প্রতিবেদক, বান্দরবান: আজ মহান মে দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের রক্তঝরা ইতিহাসের দিন। হে মার্কেট আন্দোলন-এর সেই আট ঘণ্টা কাজের দাবির সংগ্রাম পেরিয়ে আজকের এই অর্জন।

আমার অনুভূতি: গেদু চাচার খোলা চিঠির পাতা থেকে

বস, আজকের দিনটা লিখতে বসে বারবার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। কারণ মে দিবস শুধু একটা তারিখ না এটা ইটভাটার আগুনে পোড়া শরীর, জুমের ঢালে কোদাল হাতে কৃষাণীর ফাটা গোড়ালি, রিকশার প্যাডেলে জীবন ক্ষয় করা মানুষটার কপালের ঘাম।

কবিতায় যখন পড়ি:

ওরা চিরকাল টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল,
ওরা মাঠে মাঠে বোনে বীজ, বোনে স্বপ্নের জাল তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে বান্দরবানের সেই নির্মাণ শ্রমিক-ভোরে কাজ শুরু, দুপুরে পান্তা-ভাত, আর সন্ধ্যায় সামান্য মজুরি নিয়ে ঘরে ফেরা। তার ঘরেও একটা নতুন কুঁড়ি আছে, যে স্কুলে যেতে চায়।

এই শহরের বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা কুলি, হোটেলের পেছনে বাসন মাজা ১২ বছরের মেয়েটা, পাহাড়ের পাদদেশে পাথর ভাঙা আদিবাসী নারী-এরা সবাই ইতিহাস গড়ে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এদের নাম থাকে না। মে দিবস এলে লাল পতাকা ওড়ে, মঞ্চে ভাষণ হয়-কিন্তু ওদের থালায় ভাত বাড়ে না।

আজ বান্দরবানের রাস্তায় মিছিল হবে। “দুনিয়ার মজদুর এক হও”-এই স্লোগান উঠবে। আমি খুঁজব সেই শেষ সারির মানুষটাকে-যে জানে না মার্কস কে, জানে না শিকাগো কোথায়; সে শুধু জানে, আজ কাজে না গেলে চুলা জ্বলবে না।

পাহাড়ের মে দিবসটা অন্যরকম

সমতলের কারখানার শ্রমিক আর পাহাড়ের জুমচাষীর লড়াই এক নয়। এখানে মেহনতি মানুষ মানে সাঙ্গু নদীর মাঝি, পর্যটন স্পটে ডাব বিক্রি করা কিশোর, কিংবা ইটভাটায় কাজ করা সেই মা-যার শিশুটি ইটের ভাটার পাশেই ঘুমায়।

এদের বঞ্চনা শুধু আট ঘণ্টার নয়-এটা জন্মজন্মান্তরের। নেই জমির অধিকার, নেই নির্দিষ্ট মজুরি, নেই ছুটি বা উৎসব ভাতা। আছে শুধু পাহাড়ের মতো নীরবতা আর বর্ষার মতো অভাব।

কবিতা কী বলে?

কবিতা বলে ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়।” কিন্তু বাস্তব বলে এই ক্ষুধার মাঝেও মানুষ স্বপ্ন দেখে। নির্মাণ শ্রমিক তার ছেলেকে বলে, “তুই ইঞ্জিনিয়ার হবি। চা-দোকানের ছেলেটা রাতে বাতির নিচে বই খোলে।

এই স্বপ্নটাই তো মে দিবসের আসল শক্তি।

শেষ কথা, গেদু চাচার কলমে

বস, মে দিবসে ফুল দিয়ে, সেলফি তুলে দায় সারলে হবে না। যে রিকশাওয়ালা আপনাকে পৌঁছে দেয়, তাকে একটু বেশি ভাড়া দিন।যে গৃহকর্মী আপনার বাসায় কাজ করে, তার সন্তানের জন্য একটা খাতা-কলম কিনে দিন।

আইন করে আট ঘণ্টা কাজ ঠিক করা গেছে-কিন্তু সম্মান? সেটা আমাদেরই দিতে হবে। ‘তুই’ থেকে ‘আপনি’ বলার অভ্যাসটাই হোক এবারের শপথ।

যারা ঘাম দিয়ে পৃথিবীকে সচল রাখে-আজ তাদের পায়ের ধুলা মাথায় তুলি। কারণ ওরাই আসল ইতিহাস, ওরাই নতুন কুঁড়ি।