কোরিয়ার সঙ্গে ২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাংলাদেশের

অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ সম্ভাবনাময় খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আকর্ষণে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার করতে চায় বাংলাদেশ।

টুইট প্রতিবেদক: প্রচলিত উন্নয়ন ঋণের ওপর নির্ভহরতা কমিয়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি ও শিল্পসহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। এরই অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কোরিয়া ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশনের (কেআইসি) সঙ্গে সম্ভাব্য ১ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের সার্বভৌম তহবিল গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের দক্ষিণ কোরিয়া সফরের দ্বিতীয় কর্মদিবসে এসব আলোচনা হয়।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সিউলে দেশটির সরকারি কর্মকর্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে বিষয়গুলো উঠে আসে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামোসহ বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক বিভিন্ন খাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আনার সম্ভাবনা নিয়ে কেআইসির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সম্ভাব্য সার্বভৌম তহবিলকে এসব বিনিয়োগের একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

পাশাপাশি কেআইসির ইকুইটি বিনিয়োগের সঙ্গে কোরিয়া এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়ন যুক্ত করা এবং কোরীয় তহবিল ব্যবস্থাপকদের সম্পৃক্ত করার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।

৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কাঠামো পর্যালোচনা

এর আগে কোরিয়া এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হোয়াং কিয়েওনের সঙ্গে বৈঠকে ২০২৩-২০২৭ মেয়াদের ৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল কাঠামো পর্যালোচনা করা হয়।

এ কাঠামোর আওতায় অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ঢাকা মহানগর গণপরিবহনের মেট্রোরেল লাইন-৫-এর দক্ষিণ অংশ, মতলব উত্তর-গজারিয়া সেতু এবং ২৬০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রকল্পগুলো বর্তমানে পর্যালোচনাধীন। অবশিষ্ট অর্থ ব্যবহারে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, স্মার্ট অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো নতুন খাতে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

এআই ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতার সম্ভাবনা

দক্ষিণ কোরিয়ার এলজি এআই রিসার্চের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির উপযোগী বৃহৎ ভাষা মডেল তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদনশিল্প ও সরকারি সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর সম্ভাবনাও আলোচিত হয়।

বাংলাদেশকে আঞ্চলিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে ফিউরিওসাএআইয়ের সঙ্গে আলোচনায় উচ্চমূল্য সংযোজনকারী প্রযুক্তিশিল্পের বিকাশ এবং এআইভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণের সম্ভাবনা উঠে আসে।

দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থ ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় উপমন্ত্রী চ্যাং হুহের সঙ্গেও বৈঠক করেন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল। সেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নত উৎপাদনশিল্প, জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়।

বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগের আহ্বান

দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহৎ প্রতিষ্ঠান স্যামসাং সিঅ্যান্ডটির সঙ্গে অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নগর উন্নয়ন, পর্যটন ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করেছে বাংলাদেশ।

ছাদভিত্তিক ও বড় পরিসরের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন নগর উন্নয়ন উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটির অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু প্রকৌশল ও নির্মাণকাজের ঠিকাদার হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী হিসেবেও যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ছাড়া ইয়ংওয়ানের আয়োজনে কোরীয় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের হালকা প্রকৌশল ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কোরিয়ার সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের লক্ষ্য এখন শুধু উন্নয়ন ঋণ সংগ্রহ নয়, বরং সরাসরি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। তবে এসব আলোচনা বাস্তব বিনিয়োগ ও প্রকল্পে রূপ নেওয়াই হবে এই সফরের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।