বান্দরবানে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় ১৬ নারীকে ধাত্রীবিদ্যা প্রশিক্ষণ দিল সেনাবাহিনী

তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণ শেষে সনদ, প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী ও যাতায়াত ভাতা প্রদান; দুর্গম পাহাড়ি জনপদে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করাই লক্ষ্য
অসীম রায় (অশ্বিনী), বান্দরবান থেকে: দুর্গম পাহাড়ি জনপদে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বান্দরবানে ১৬ পাহাড়ি ও বাঙালি নারীকে ধাত্রীবিদ্যা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এ উদ্যোগ দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পৌঁছাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তিন সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বান্দরবান সেনানিবাসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁদের হাতে সনদপত্র, প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী ও যাতায়াত ভাতা তুলে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬৯ পদাতিক ব্রিগেডের উদ্যোগে, বান্দরবান সেনা রিজিয়নের তত্ত্বাবধানে এবং ৭ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাপনায় এ প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়। বৃহস্পতিবার বান্দরবান সেনানিবাসের মিলিটারি ড্রেসিং স্টেশনের (এমডিএস) দ্বিতীয় তলায় সমাপনী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ৭ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সরফরাজ হায়দার, এমপিএইচ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বান্দরবান সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন ও তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. শাহীন হোসেন চৌধুরী এবং ৬৯ পদাতিক ব্রিগেডের জি-৩ (শিক্ষা) লেফটেন্যান্ট জান্নাতুল মাওয়া। এ ছাড়া ৭ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের বিভিন্ন পদমর্যাদার সেনা কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীসহ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রশিক্ষণে যা শিখলেন ১৬ নারী
তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর পরিচর্যা, নিরাপদ প্রসবের মৌলিক ধারণা, নবজাতকের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, বিপৎসংকেত শনাক্তকরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
প্রশিক্ষণে প্রথম স্থান অর্জন করেন তানজিলা মুস্তাজিন ময়না। দ্বিতীয় হন লাল খ্রিস ময় বম এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করেন জেনি ত্রিপুরা।
প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেকের হাতে প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে প্যারাসিটামল, অ্যান্টিহিস্টামিন, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, ক্যালসিয়াম, আয়রন ট্যাবলেট, পিপিআই, ওরস্যালাইন, ফেস মাস্ক, গ্লাভস, বায়োডিন সলিউশন, পোভিসেফ অয়েন্টমেন্ট, সেভলন ক্রিম, রক্তচাপ মাপার যন্ত্র, পালস অক্সিমিটার, থার্মোমিটার ও ফার্স্ট এইড ব্যাগ।
এ ছাড়া যাতায়াত খরচ বাবদ প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে নগদ এক হাজার টাকা করে মোট ১৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
দুর্গম পাহাড়ে নিরাপদ মাতৃত্বের চ্যালেঞ্জ
৪ হাজার ৪৭৯ দশমিক ০৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বান্দরবান জেলায় সাতটি উপজেলায় ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯৮৩ জন, যা মোট জনসংখ্যার ৪১ দশমিক ১৫ শতাংশ।
দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও দীর্ঘ দূরত্বের কারণে জেলার অনেক পাহাড়ি পাড়ার বাসিন্দারা নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা পেতে সমস্যার মুখোমুখি হন। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব এবং নবজাতকের পরিচর্যা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
এ বাস্তবতায় স্থানীয় নারীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে প্রশিক্ষিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১৬ নারী নিজ নিজ পাড়ায় গর্ভবতী মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়ানো, প্রাথমিক সহায়তা দেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা মাকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা মোকাবিলায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীরা গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হয়ে উঠতে পারেন।








