বীমা খাতে মানিলন্ডারিং ঠেকাতে বিএফআইইউর কঠোর নির্দেশনা

১০ লাখ টাকা বা বেশি নগদ লেনদেনে প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক, গ্রাহক যাচাই ও নজরদারিতে জোর।
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক: বীমা খাতে মানিলন্ডারিং, সন্ত্রাসী অর্থায়ন ও ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের বিস্তারে অর্থায়ন প্রতিরোধে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। নতুন নির্দেশনায় গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি, সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা জোরদার করতে বলা হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর ২০২৬) তারিখে জারি করা বিএফআইইউ সার্কুলার নং-৩৪ অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর সংশ্লিষ্ট ধারার ক্ষমতাবলে জারি করা সার্কুলারটি আগের কয়েকটি নির্দেশনা প্রতিস্থাপন করেছে।
কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট গঠনের নির্দেশ
প্রতিটি বীমা প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা পর্ষদ বা সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদনে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধ নীতিমালা প্রণয়ন ও হালনাগাদ করতে হবে। প্রধান কার্যালয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট গঠন এবং একজন চিফ অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসার (ক্যামলকো) নিয়োগ করতে হবে।
ক্যামলকোর নেতৃত্বে প্রস্তুত করা বার্ষিক প্রতিবেদন ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে বিএফআইইউতে জমা দিতে হবে। শাখা, ইউনিট ও এজেন্ট পর্যায়েও দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিপালন কর্মকর্তা রাখতে হবে।
গ্রাহক যাচাই ও ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি
বেনামে বা ছদ্মনামে পলিসি খোলা যাবে না। নিষিদ্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামেও পলিসি খোলা কিংবা পরিচালনা করা যাবে না। গ্রাহকের পরিচয় ও প্রকৃত সুবিধাভোগী যাচাই করতে হবে। কোম্পানির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারধারীকে প্রকৃত সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, তাঁদের পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বাড়তি যাচাই বাধ্যতামূলক। পাঁচ বছর বা তার কম মেয়াদের পলিসিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে গণ্য করতে হবে। কম ঝুঁকির গ্রাহকের পরিচিতি প্রতি পাঁচ বছর এবং উচ্চ ঝুঁকির গ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রতি বছর হালনাগাদ করতে হবে।
১০ লাখ টাকা বা বেশি নগদ লেনদেনে প্রতিবেদন
ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা ছাড়া অন্য মাধ্যমে এক দিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ লেনদেন হলে পরবর্তী মাসের সাত কর্মদিবসের মধ্যে বিএফআইইউতে নগদ লেনদেন প্রতিবেদন (সিটিআর) জমা দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অন্তত পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে।
জটিল, অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হলে দ্রুত পরিপালন কর্মকর্তাকে জানাতে হবে। যাচাই-বিশ্লেষণের পর নির্ধারিত পদ্ধতিতে সন্দেহজনক লেনদেন বা কার্যক্রম প্রতিবেদন (এসটিআর/এসএআর) বিএফআইইউতে জমা দিতে হবে।
নিরীক্ষা, প্রশিক্ষণ ও নথি সংরক্ষণ
জাতিসংঘ ও সরকারি নিষেধাজ্ঞার তালিকা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তালিকাভুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে পলিসি বা লেনদেন স্থগিত করে পরবর্তী কর্মদিবসের মধ্যে বিএফআইইউকে জানাতে হবে।
শাখা ও এজেন্ট পর্যায়ে বার্ষিক স্বনির্ধারণী সম্পন্ন করে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠাতে হবে। নিয়োগের আগে কর্মকর্তা, এজেন্ট ও মধ্যস্থতাকারীদের কর্মসংস্থান, ঋণ-সংক্রান্ত ইতিহাস ও অপরাধমূলক রেকর্ড যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং পলিসি বন্ধ বা দাবি পরিশোধের পর সংশ্লিষ্ট নথি অন্তত পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে।
সার্কুলারের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বীমা পলিসির জন্য কেওয়াইসি ফরম, সন্দেহজনক ও নগদ লেনদেন প্রতিবেদন এবং স্বনির্ধারণী চেকলিস্ট যুক্ত করা হয়েছে। বিএফআইইউর পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তাকিজুর রহমান সার্কুলারটিতে স্বাক্ষর করেছেন। এটি সব বীমা প্রতিষ্ঠান, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে বীমা খাতে আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ ও পরিপালন ব্যবস্থা আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।






