চাকরি পাবে না ৮০ কোটি তরুণ, সতর্ক করল বিশ্বব্যাংক

আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবে ১২০ কোটি তরুণ, বিপরীতে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে মাত্র ৪০ কোটি; সংকট মোকাবিলায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর তাগিদ।

টুইট প্রতিবেদক: বিশ্বজুড়ে তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর সভাপতি অজয় বঙ্গা। তাঁর সতর্কবার্তা অনুযায়ী, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বের প্রায় ১২০ কোটি তরুণ-তরুণী কর্মজীবনে প্রবেশ করবে।

এই সময়ে সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে মাত্র ৪০ কোটি। ফলে প্রায় ৮০ কোটি তরুণের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি না হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের বার্ষিক সাধারণ সভার পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে দেওয়া মূল বক্তব্যে তিনি এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। রোববার (১৮ অক্টোবর) বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় থেকে এ তথ্য জানানো হয়।

তরুণদের কর্মসংস্থান বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ

অজয় বঙ্গা বলেন, কর্মসংস্থানের এই ঘাটতি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে রয়েছে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেও কাজ না পাওয়া হতাশ তরুণ-তরুণী এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাবে কর্মহীন থাকা অসংখ্য মানুষ।

তাঁর মতে, তরুণ জনগোষ্ঠীর মেধা ও কর্মক্ষমতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো না গেলে এই সমস্যা এক দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তা বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

বিশ্বব্যাংকপ্রধানের এই সতর্কবার্তা বিশ্ব অর্থনীতির সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে—ক্রমবর্ধমান তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ

অজয় বঙ্গা জানান, ২০২৩ সালে দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিশ্ব অর্থনীতি যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল, সেগুলোর অনেকই এখনো কাটেনি। বরং ভূরাজনৈতিক সংঘাত, উচ্চ ঋণের বোঝা, সরকারি তহবিলের সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি ও সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের উচ্চমূল্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এ পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমেও পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানান অজয় বঙ্গা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্প অনুমোদনের গড় সময় ১৯ মাস থেকে কমিয়ে ৯ মাসে আনা হয়েছে। পাশাপাশি ১৫৩টি জটিল মূল্যায়নব্যবস্থার পরিবর্তে ২২টি ফলাফল ও প্রভাবভিত্তিক সূচক চালু করা হয়েছে।

এ ছাড়া মূলধন কাঠামোর পুনর্বিন্যাসের ফলে আগামী এক দশকে আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা আরও ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তিনটি অগ্রাধিকার

বিশ্বব্যাংকপ্রধানের মতে, টেকসই কর্মসংস্থান তৈরিতে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো—উন্নত অবকাঠামো নির্মাণ, ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি।

তিনি জানান, গত এক বছরে বিশ্বব্যাংক ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে ১১২০ কোটি মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ সংগ্রহ করা হয়েছে। তিন বছর আগের তুলনায় এই অর্থের পরিমাণ তিন গুণ। নিজস্ব ও সংগৃহীত তহবিল মিলিয়ে গত বছর মোট অর্থায়নের পরিমাণ ২৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।

এই অর্থের বড় অংশ অবকাঠামো, জ্বালানি, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটনের মতো কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের কাছে এসব উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে, কারণ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেই কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধান হয় না। প্রবৃদ্ধির সুফল যাতে নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি এবং মানুষের আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নতুন সম্ভাবনা

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন অজয় বঙ্গা। তাঁর মতে, অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি অনেক দেশের নাগালের বাইরে থাকলেও সাধারণ প্রয়োগভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জীবন ও জীবিকায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

কৃষকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিক্ষকের পাঠদানের মান উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরিতে এসব প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ডিজিটাল সংযোগ ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিদ্যুৎ ও কৃষিতে বিশেষ উদ্যোগ

বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির অগ্রগতি তুলে ধরে অজয় বঙ্গা জানান, ‘মিশন ৩০০’ উদ্যোগের আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকার ৩০ কোটি মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষ এ সুবিধা পেয়েছেন।

এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বৃহত্তর লক্ষ্যের অংশ হিসেবে ৪০ কোটি মানুষকে সহায়তার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বিশ্বব্যাংক।

একই সঙ্গে ২০ কোটি ক্ষুদ্র কৃষককে শুধু নিজেদের জীবনধারণের জন্য উৎপাদন করা কৃষি থেকে উদ্বৃত্ত উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে সক্ষম কৃষকে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে অজয় বঙ্গা বলেন, বিশ্বনেতারা তখনই উপলব্ধি করেছিলেন যে একটি দেশের সমৃদ্ধি অন্য দেশের উন্নয়ন থেকেও বিচ্ছিন্ন নয়। সেই ধারণার ভিত্তিতে সরকারি তহবিল, বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য সংস্থা ও নতুন প্রযুক্তির সমন্বয়ে উন্নয়নের পথ তৈরি করতে চায় বিশ্বব্যাংক।

তবে আগামী দেড় দশকে বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তির প্রসার এবং দক্ষতাভিত্তিক কাজের সুযোগ তৈরি করতে না পারলে জনসংখ্যার এই সম্ভাবনাময় অংশ অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিবর্তে সংকটের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তার মূল তাৎপর্য হলো, ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় এখন থেকেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরির কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই এ সংকট মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ পথ।