‘ছেলেটি চিপস চেয়েছিল, কে জানত এটাই শেষ দেখা!’

কক্সবাজারের রিসোর্টে আগুনে স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালকসহ পরিবারের ছয়জনকে হারানোর শঙ্কায় নূর আলম; ডিএনএ পরীক্ষায় মরদেহ শনাক্তের অপেক্ষা।
টুইট প্রতিবেদক: ‘বিদায় নেওয়ার সময় ছেলেটা চিপস খেতে চেয়েছিল। একটা চিপস দিয়ে এসেছিলাম। কে জানত, ওদের সঙ্গে এটাই শেষ দেখা, শেষ কথা হবে!’ কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নূর আলম। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে স্ত্রী ফারিহা কবির, সাত বছরের একমাত্র সন্তান মো. ফাইজান নূর এবং শ্যালকসহ পরিবারের ছয় সদস্যকে হারানোর শোকে দিশেহারা তিনি।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) ভোরে ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি ‘টুপটুপ রিসোর্টে’ আগুন লাগে। এর আগে শুক্রবার রাতে স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালকসহ পরিবারের নয়জনকে সেখানে রেখে কর্মস্থলে ফিরে গিয়েছিলেন একটি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত নূর আলম। অগ্নিকাণ্ডের পর পরিবারের তিন সদস্য জীবিত উদ্ধার হলেও বাকি ছয়জনের মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
শেষ বিদায়ে ছিল না বিচ্ছেদের আভাস
নূর আলম জানান, দুই দিনের ছুটি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার জন্য আগের দিন ফিরে আসেন। বিদায়ের সময় শ্যালক নাফিসের হাত ধরে অনুরোধ করেছিলেন, বোন ও ভাগ্নেকে যেন নিরাপদে নিয়ে আসেন।
ফেরার সময় বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার আগে ছেলের হাতে একটি চিপস তুলে দিয়েছিলেন তিনি। স্ত্রীও চেয়েছিলেন পাশের বাসার পরিচিতদের জন্য কিছু উপহার কিনতে। তখন হাতে টাকা না থাকায় দিতে পারেননি নূর আলম। পরে বাসস্ট্যান্ডে বসে শ্যালকের হাতে টাকা দিয়ে আসেন, যাতে তিনি বোনকে নিয়ে কেনাকাটা করতে পারেন।
কিন্তু সেই বিদায়ই যে জীবনের শেষ বিদায় হয়ে থাকবে, তা কল্পনাও করেননি তিনি।
ফোনে স্বজনদের না পেয়ে বাড়ে উদ্বেগ
নূর আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৮টার দিকে তাঁর মামা ফোন করে কক্সবাজারের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। তখনো তিনি জানতেন না, স্বজনেরা কী ভয়াবহ বিপদের মধ্যে পড়েছেন।
পরিবারের সদস্যদের ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। এরপর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ, আশপাশের হোটেল ও অভ্যর্থনাকক্ষে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশের সঙ্গেও কথা বলেন।
পুলিশ তাঁকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের আশ্বাস দেয় এবং ফায়ার সার্ভিস পাঠানোর কথা জানায়। কিন্তু এরই মধ্যে ঘটে যায় ভয়াবহ বিপর্যয়।
নূর আলম বলেন, ‘পরবর্তীতে তো সব শেষ হয়ে গেছে, ৩০ মিনিটের মধ্যেই সব শেষ। ফায়ার সার্ভিস আসার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে।’
বিকল্প পথ থাকলে বাঁচতে পারত আরও প্রাণ
অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে নূর আলমের ধারণা, সকালে নাশতা তৈরির প্রস্তুতির সময় রিসোর্টের রান্নাঘরে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। গ্যাস সিলিন্ডারের সমস্যাও এর কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
তাঁর অভিযোগ, রিসোর্টের সংশ্লিষ্ট ভিলায় বের হওয়ার বিকল্প পথ বা জরুরি নির্গমনপথ না থাকায় আগুনের মধ্যে আটকে পড়া ব্যক্তিদের প্রাণ বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।
নূর আলমের ভাষায়, ‘যদি বের হওয়ার বিকল্প পথ থাকত, হয়তো বাকি পাঁচজনই বের হতে পারত। হয়তো আমার স্ত্রী বের হতে পারত না, কিন্তু আমার বাচ্চাটা বেঁচে যেত, বোনগুলো বেঁচে যেত।’
তিনি জানান, পরিবারের যে তিন সদস্য জীবিত উদ্ধার হয়েছেন, তাঁরা একই কক্ষে ছিলেন। জানালা ভেঙে বের হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তাঁরা। অন্য কক্ষগুলোতেও বের হওয়ার সুযোগ থাকলে আরও কয়েকজনকে বাঁচানো সম্ভব হতো বলে মনে করেন তিনি।
স্ত্রীর সঙ্গে শেষ কথা রাত সোয়া ১১টায়
স্ত্রীর সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি এখন বারবার তাড়া করছে নূর আলমকে। তিনি জানান, কর্মস্থলে ফেরার পর শুক্রবার রাত সোয়া ১১টার দিকে স্ত্রী ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি ঠিকমতো পৌঁছেছেন কি না।
সেই কথোপকথনই ছিল স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর শেষ কথা। এরপর শনিবার ভোরের অগ্নিকাণ্ড তাঁদের জীবন ওলটপালট করে দেয়।
নূর আলমের বিশ্বাস, শ্যালক নাফিস বোন ও ভাগ্নেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, স্বজনদের নিরাপদে রাখার দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই হয়তো নিজের জীবন রক্ষা করতে পারেননি নাফিস।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার শ্যালক নিজে চাইলে বাঁচতে পারত। কিন্তু আমার কথা রাখতে গিয়ে, বোন আর ভাগ্নেকে বাঁচাতে গিয়ে তাকে জীবন দিতে হয়েছে।’
ডিএনএ পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা
অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মরদেহ পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নূর আলম জানান, স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ শনাক্ত করতে ইতিমধ্যে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কার্যালয়ে গিয়ে রক্তের নমুনা দিয়েছেন তিনি।
এখন ডিএনএ পরীক্ষার ফলের অপেক্ষায় রয়েছেন শোকাহত এই স্বামী ও বাবা। কবে পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া যাবে, তা এখনো নিশ্চিত নন তিনি।
চোখের পানি মুছতে মুছতে নূর আলম বলেন, ‘কখন নাগাদ প্রতিবেদন পাব এবং স্ত্রী ও আদরের সন্তানের লাশ ছুঁয়ে দেখতে পারব, সেটা এখনো বলতে পারছি না।’
একটি চিপসের আবদার, বিদায়বেলার কয়েকটি কথা আর স্ত্রীর শেষ ফোনকল, সবকিছুই এখন তাঁর কাছে অমূল্য স্মৃতি। স্বজনদের হারানোর এই শোকের পাশাপাশি রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও তাঁর মনে জমেছে অসংখ্য প্রশ্ন।
এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও সামনে এনেছে পর্যটনকেন্দ্রের আবাসনস্থলে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি নির্গমনপথ এবং কার্যকর উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করার গুরুত্ব। যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে এমন প্রাণহানি এড়ানো যেত কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি।






