মানব পাচার রোধে পিছিয়ে বাংলাদেশ

মার্কিন প্রতিবেদনে উদ্বেগ, ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ ও পুনর্বাসনে ঘাটতি; অভিবাসী কর্মীদের ঋণের ফাঁদও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি।

টুইট প্রতিবেদক: মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নিলেও এ অপরাধ নির্মূলে ন্যূনতম মানদণ্ড পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। বিশেষ করে মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, পুনর্বাসন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৬ সালের মানব পাচারবিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস রিপোর্ট’-এ বাংলাদেশকে আগের মতোই দ্বিতীয় ধাপে (টিয়ার-২) রাখা হয়েছে। এই শ্রেণিতে থাকা দেশগুলো মানব পাচার নির্মূলে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। তবে এসব মানদণ্ড অর্জনের জন্য উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

আইনি উদ্যোগ বেড়েছে, রয়ে গেছে বাস্তবায়নের ঘাটতি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের সামগ্রিক উদ্যোগ আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। এ অপরাধ মোকাবিলায় আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়ন, তদন্ত ও মামলা বাড়ানোর উদ্যোগ এবং অপরাধী ও ভুক্তভোগী শনাক্তকরণের নির্দেশিকা হালনাগাদ করা হয়েছে।

এ ছাড়া মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে ডিজিটাল জাতীয় রেফারেল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশগামী কর্মীদের সুরক্ষা জোরদার করেও পাচারের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা চলছে।

তবে এসব উদ্যোগের সুফল বাস্তবে কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্তকরণের হার কমেছে।

একই সঙ্গে পুনর্বাসন ও সুরক্ষামূলক কার্যক্রমও প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত।
রোহিঙ্গা ও ফেরত আসা কর্মীরা বেশি ঝুঁকিতে
মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, পুনর্বাসন ও সুরক্ষার ঘাটতি বিশেষভাবে দেখা যাচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ সীমিত থাকলে এসব জনগোষ্ঠী পাচারকারীদের প্রতারণা ও শোষণের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ কারণে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তা ও পুনর্বাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

নিয়োগ ফির বোঝায় বাড়ছে পাচারের ঝুঁকি
প্রতিবেদনে অভিবাসী কর্মীদের কাছ থেকে নিয়োগ ফি আদায়ের প্রচলিত ব্যবস্থাকে মানব পাচারের ঝুঁকি বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদেশে চাকরি পেতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে অনেক কর্মী ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পরে সেই ঋণ পরিশোধের চাপে তাঁরা শোষণমূলক কর্মপরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হতে পারেন। এ পরিস্থিতি তাঁদের স্বাধীনভাবে কর্মস্থল ত্যাগ করা কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সুযোগও সীমিত করে দিতে পারে।

তাই অভিবাসন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ ফির বোঝা কমানো, প্রতারণামূলক নিয়োগ বন্ধ করা এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর নজরদারি জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ।

পাচারকারীদের জবাবদিহির আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমাস টমি পিগট বলেছেন, মানব পাচার স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার মৌলিক মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত।

তিনি বলেন, মানব পাচারকারীদের শাস্তি দিতে এবং নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে।
পিগট আরও জানান, ট্রাম্প প্রশাসন মানব পাচারকারী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং তাঁদের বিচারের মুখোমুখি করতে সব ধরনের সুযোগ কাজে লাগাবে।

কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অগ্রগতির স্বীকৃতি থাকলেও মানব পাচার নির্মূলে আরও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ বাড়ানো, পুনর্বাসন ও সুরক্ষাসেবা সম্প্রসারণ, অভিবাসী কর্মীদের নিয়োগসংক্রান্ত শোষণ বন্ধ এবং পাচারকারীদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি।

মানব পাচার প্রতিরোধে আইনি উদ্যোগের পাশাপাশি আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা, ভুক্তভোগীদের অধিকার রক্ষা এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তবসম্মত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অগ্রগতি আরও দৃশ্যমান হতে পারে।