রাজশাহীতে নারীসহ ফ্ল্যাটে আটক সাবেক ওসি মাহবুব সাময়িক বরখাস্ত

বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগের অভিযোগ; আগের অভিযোগ ও বিভাগীয় প্রক্রিয়াও ফের আলোচনায়। 

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী: রাজশাহীর নাদের হাজির মোড় এলাকায় একটি ফ্ল্যাটে এক নারীর সঙ্গে অবস্থানকালে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া সাবেক ওসি মাহবুব আলমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদ শুক্রবার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এর আগে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকালে নগরীর চন্দ্রিমা থানার নাদের হাজির মোড় এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে মাহবুব আলম ও এক নারীকে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা বের করে থানায় নিয়ে যান। দীর্ঘ সময় দরজা না খোলায় ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় ফ্ল্যাটের দরজা খোলা হয় বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

ঘটনার পর মাহবুব আলমের সঙ্গে থাকা নারীকে তাঁর স্ত্রী বলে দাবি করেন তিনি। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত আন্নি আক্তার নিজেকেও মাহবুবের স্ত্রী দাবি করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। আন্নি আক্তারের অভিযোগের মধ্যে ১৭ লাখ টাকা নেওয়া এবং ওই নারীর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

পুলিশ জানিয়েছে, ফ্ল্যাটে থাকা নারী মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ না করায় তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফৌজদারি অপরাধের কোনো অভিযোগ না থাকায় পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগের অভিযোগ

ঘটনাটির প্রশাসনিক দিকও সামনে এসেছে। সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট মোস্তাক আহমেদ জানিয়েছেন, মাহবুব আলমের কোনো ছুটি বা অনুমতি ছিল না। তিনি কাউকে না জানিয়ে রাজশাহীতে এসেছিলেন। বিষয়টি নওগাঁ জেলা পুলিশকে জানানো হয়েছে।

মাহবুব আলম বর্তমানে নওগাঁ জেলা পুলিশের সঙ্গে যুক্ত এবং সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আগের ঘটনাও তদন্তের আওতায়

মাহবুব আলম ২০২৪ সালে রাজশাহীর চন্দ্রিমা থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর দপ্তরে এক ব্যক্তির সঙ্গে খাম লেনদেনের একটি ভিডিও প্রকাশ্যে আসে। এর পর ৬ জুলাই ২০২৪ তাঁকে চন্দ্রিমা থানা থেকে প্রত্যাহার করে আরএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। সে সময় পুলিশ কর্মকর্তারা ভিডিওটি তদন্তের কথা জানিয়েছিলেন।

এর আগে ২০২৩ সালে চারঘাট মডেল থানার ওসি থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগসংক্রান্ত অডিও প্রকাশের পর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯ অক্টোবর ২০২৩ আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন স্বাক্ষরিত আদেশে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত এবং বিভাগীয় মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে আরএমপির ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত সার্জেন্ট মোসাঃ সাবিহা আক্তার মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে তিনি বিয়ের তথ্য গোপন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, জোরপূর্বক গর্ভপাত এবং প্রায় ২০ লাখ টাকা আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ করেন। তবে এগুলো অভিযোগ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে; অভিযোগগুলোর সত্যতা বা এ বিষয়ে চূড়ান্ত বিভাগীয় সিদ্ধান্তের স্বাধীন সরকারি নথি পাওয়া যায়নি। মাহবুব আলম অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

নতুন করে বিভাগীয় তদন্তের মুখে

সর্বশেষ ঘটনায় মাহবুব আলমকে সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অফিস আদেশ পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় কার্যক্রম নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগের বিষয়টিও প্রশাসনিক তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

তবে ফ্ল্যাটে ওই নারীর সঙ্গে তাঁর অবস্থানের কারণ, তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্কের প্রকৃতি এবং আন্নি আক্তারের আর্থিক ও পারিবারিক অভিযোগ—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নথিপত্রের ফলাফল অপেক্ষা করা প্রয়োজন।