২৩ বছর পর মুক্তি, জীবিকার ভরসা জেলা প্রশাসকের দেওয়া ভ্যান

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘ ২৩ বছর কারাভোগ শেষে মুক্তি পেলেও স্বস্তি ফেরেনি রাজশাহীর পবা উপজেলার বিলধর্মপুর গ্রামের মিঠুর জীবনে। কারাগারের চার দেয়াল পেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও পরিবারের আর্থিক সংকট ও কর্মসংস্থানের অভাবে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছিল তাঁর। এমন পরিস্থিতিতে জীবিকার অবলম্বন হিসেবে রাজশাহী জেলা প্রশাসনের দেওয়া একটি ভ্যান তাঁর জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাজশাহী জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সামনে মিঠু ও বাগমারা উপজেলার কোন্দা পশ্চিমপাড়া গ্রামের মো. ইসরাফিলের হাতে দুটি ভ্যান তুলে দেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। দীর্ঘ কারাভোগ শেষে মুক্তি পাওয়া এই দুই ব্যক্তির কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্যান দুটি দেওয়া হয়।
এ সময় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উম্মে কুলসুম সম্পা ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহা. সবুর আলী উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মুক্তির পর কর্মসংস্থানের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে একটি ভ্যান চেয়ে আবেদন করেছিলেন মিঠু। ভ্যান পাওয়ার পর আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ‘জীবনের এতগুলো বছর কারাগারে কেটে গেছে। মুক্তির পর বাইরে এসে কীভাবে সংসার চালাব, কীভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াব—এ নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলাম। জেলা প্রশাসক স্যার আমার কষ্টের কথা শুনে আমাকে একটি ভ্যান দিয়েছেন। এই ভ্যান আমার কাছে শুধু একটি যানবাহন নয়, এটি নতুন করে বাঁচার অবলম্বন। স্যারের প্রতি আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন পরিবারের কাছ থেকে দূরে ছিলাম। মুক্তির পর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল, কিন্তু হাতে কোনো কাজ ছিল না। এখন ভ্যান চালিয়ে আয় করতে পারব এবং নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারব। জেলা প্রশাসক স্যার যে সহায়তা করেছেন, তা আমার মতো অসহায় মানুষের জন্য অনেক বড় পাওয়া।’
রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের নথি অনুযায়ী, মিঠু ৩০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত ছিলেন। ২০০৩ সালের ১১ অক্টোবর থেকে তিনি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। চলতি বছরের ১৬ জুলাই সাজা শেষে তিনি মুক্তি পান। এরপর জীবিকা নির্বাহের জন্য আর্থিক সহায়তা হিসেবে একটি ভ্যান চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন।
অন্যদিকে, বাগমারার কোন্দা পশ্চিমপাড়া গ্রামের মো. ইসরাফিলও দীর্ঘ ২৩ বছর কারাভোগের পর সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছেন। তাঁর বাবার নাম রহিম উদ্দিন। দীর্ঘদিন কারাভোগের কারণে তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে। মুক্তির পর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকেও একটি ভ্যান দেওয়া হয়েছে।
ভ্যান বিতরণ শেষে জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন কারাভোগ শেষে মুক্তি পাওয়া এই দুই ব্যক্তি কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তাঁর কাছে জানিয়েছিলেন। কারাগার পরিদর্শনের সময় তাঁদের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘তাঁদের দেখেছি, তাঁরা নিতান্তই গরিব। তাঁরা কারাগার থেকে বের হওয়ার পর কী করবেন, সেটি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে বাকি জীবন সুন্দরভাবে কাটাতে পারবেন। সেই উদ্দেশ্যেই তাঁদের দুটি ভ্যান দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, কারাভোগ শেষে তাঁরা যাতে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সে লক্ষ্যেই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভ্যান দুটির মাধ্যমে মিঠু ও ইসরাফিল নিজেদের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।






