মদিনায় ১১ কোটি টনের বেশি ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধ আকরিকের সন্ধান সৌদির

জাবাল সাইয়িদ প্রকল্পে ভারী বিরল মাটির খনিজের উচ্চ ঘনত্বও শনাক্ত; ইউরেনিয়ামের অর্থনৈতিক ব্যবহার ও ‘ইয়েলো কেক’ উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে রিয়াদ।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সৌদি আরবের মদিনা অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ খনিজ আকরিকের মধ্যে সম্ভাবনাময় ইউরেনিয়াম ও বিরল মাটির খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ৭০তম সাধারণ সম্মেলনে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান এ ঘোষণা দেন।

সৌদি জ্বালানিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, মদিনা অঞ্চলের জাবাল সাইয়িদ প্রকল্পে অনুসন্ধান ও ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় আনুমানিক ১১৪ মিলিয়ন টন আকরিকের সম্পদ শনাক্ত হয়েছে। এতে বিশেষ করে ভারী ধরনের বিরল মাটির খনিজের উচ্চ ঘনত্বের পাশাপাশি সম্ভাবনাময় ইউরেনিয়াম ঘনত্ব পাওয়া গেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে একই সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১১০ মিলিয়ন টন হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

১১৪ মিলিয়ন টন মানেই ১১৪ মিলিয়ন টন ইউরেনিয়াম নয়

সৌদির এই ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ১১০ বা ১১৪ মিলিয়ন টন হলো মোট আকরিকের আনুমানিক পরিমাণ; এটি বিশুদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নয়।

এই আকরিকের মধ্যে ঠিক কত পরিমাণ ইউরেনিয়াম রয়েছে, ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কত এবং এর কতটা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য—সেসব বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এটিকে সরাসরি ‘১১ কোটি টন ইউরেনিয়াম আবিষ্কার’ বলা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না।

বিরল খনিজেও বড় সম্ভাবনা

জাবাল সাইয়িদ প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু ইউরেনিয়ামে সীমাবদ্ধ নয়। সৌদি কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে বিরল মাটির খনিজের—বিশেষ করে ভারী বিরল মাটির উপাদানের—উচ্চ ঘনত্ব শনাক্ত হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশলগত শিল্পে এসব খনিজের ব্যবহার থাকায় বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় এগুলোর গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

সৌদি আরব ‘ভিশন ২০৩০’-এর আওতায় তেলনির্ভর অর্থনীতির বাইরে খনিজ সম্পদকে অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। জাবাল সাইয়িদের এই আবিষ্কার সেই পরিকল্পনায় নতুন গতি দিতে পারে।
ইউরেনিয়াম থেকে ‘ইয়েলো কেক’ উৎপাদনের লক্ষ্য
সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশটির জাতীয় পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন উৎস থেকে ইউরেনিয়াম সম্পদ অনুসন্ধান ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।

এর অংশ হিসেবে ফসফেট সার উৎপাদনের সময় ফসফরিক অ্যাসিডের সঙ্গে থাকা ইউরেনিয়াম আলাদা করার সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। ফরাসি পারমাণবিক প্রতিষ্ঠান ওরানোর সঙ্গে পরীক্ষামূলক কাজেও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে সৌদি পক্ষ জানিয়েছে।

রিয়াদের পরিকল্পনা শুধু আকরিক উত্তোলনে সীমাবদ্ধ নয়। খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ, পৃথকীকরণ, পরিশোধন এবং ইউরেনিয়াম থেকে ‘ইয়েলো কেক’ উৎপাদনের মতো মূল্য সংযোজনকারী ধাপগুলোও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ বলে জানানো হয়েছে। তবে এসব কার্যক্রম অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা ও সৌদির আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে নেওয়া হবে।

শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর জোর

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার, আইএইএ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান সৌদি আরবের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ বলে তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, সৌদি আরব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বাইরে গিয়ে কিংবা পাহাড়ের গভীরে গোপন স্থাপনা তৈরি করে তার শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনা করছে না। দেশটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও আইএইএর সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছে বলে তিনি জানান।

আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসিও ১৪ সেপ্টেম্বর সৌদি জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর জানান, সৌদি আরব পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি ও গবেষণা চুল্লি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে দেশটির প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

সৌদির পারমাণবিক ভবিষ্যতে নতুন মাত্রা

মদিনার এই আবিষ্কার সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিজস্ব ইউরেনিয়াম সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একটি স্থানীয় পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে আকরিক শনাক্ত হওয়া থেকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য ইউরেনিয়াম উৎপাদনে যেতে আরও কয়েকটি ধাপ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে বিস্তারিত অনুসন্ধান, মজুতের পরিমাণ ও মান নির্ধারণ, উত্তোলনের সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদন।

এখন নজর জাবাল সাইয়িদে

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জাবাল সাইয়িদ প্রকল্পে আবিষ্কৃত সম্পদের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণে পরবর্তী ভূতাত্ত্বিক গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বিশেষ করে ইউরেনিয়ামের প্রকৃত ঘনত্ব, মোট উত্তোলনযোগ্য পরিমাণ এবং বিরল মাটির ভারী উপাদানগুলোর ধরন ও পরিমাণ প্রকাশ পেলে এই আবিষ্কারের কৌশলগত গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হবে।

তবে এরই মধ্যে একটি বিষয় পরিষ্কার—সৌদি আরব শুধু তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে খনিজ, বিরল মাটির উপাদান এবং পারমাণবিক জ্বালানি খাতেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। মদিনার জাবাল সাইয়িদ প্রকল্প সেই বৃহত্তর রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।