জাতিসংঘের সভাপতির আসনে বাংলাদেশ, নতুন উচ্চতায় দেশের কূটনীতি

চার দশক পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব বাংলাদেশের; রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু অর্থায়ন ও বৈশ্বিক শান্তিতে নেতৃত্বের সুযোগ।

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে আজ ৮ সেপ্টেম্বর যুক্ত হতে যাচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ ৪০ বছর পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ফলে আগামী এক বছর জাতিসংঘের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাবে ঢাকা।

গত ২ জুন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ভোটে ড. খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পেয়ে ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হয়েছিলেন। চার দশক পর আবারও বাংলাদেশ এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের কূটনৈতিক অবস্থান আরও দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি নতুন করে তুলে ধরার বড় সুযোগ দেবে। দুর্যোগ, দারিদ্র্য কিংবা রোহিঙ্গা সংকটের মতো চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বাংলাদেশ যে বিনিয়োগ, ব্যবসা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সংস্কারের সম্ভাবনাময় দেশ তা বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।

এই অধিবেশনে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হতে পারে রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমারের চলমান সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করা হবে।

জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও অংশ নেবেন। তাঁর প্রথম জাতিসংঘ ভাষণে বাংলাদেশের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতির দর্শন তুলে ধরার কথা রয়েছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব বাংলাদেশের হাতে থাকায় রোহিঙ্গা সংকটসহ বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের কূটনৈতিক পরিসরও বাড়বে।

৮১তম অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য—‘আস্থার পুনরুদ্ধার এবং বৈশ্বিক সংহতিকে পুনরুজ্জীবিত করা’। এই প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ক্ষয়ক্ষতি তহবিল নিশ্চিত করা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়ন বাড়ানো এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর অধিকতর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে থেকে বেসামরিক নাগরিক সুরক্ষা, গাজাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়ে সংলাপ ও সমঝোতা তৈরিতে বাংলাদেশ ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে।

আগামী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা অংশ নেবেন। এই পর্বে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক বিরোধ, যুদ্ধ, মানবিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন ও অভিবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসবে। এসব বিষয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে সংলাপের পরিবেশ তৈরি করা হবে বাংলাদেশের জন্য বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা।

সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বের সময়েই জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হবে ৩১ ডিসেম্বর। এরপর জাতিসংঘের দশম মহাসচিব নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া শুরু হবে। ফলে ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বের সময় জাতিসংঘের নেতৃত্ব নির্বাচনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্রক্রিয়া হিসেবে সামনে আসবে।

আগামী এক বছর ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতিসংঘের বহুপক্ষীয় কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকবে। যদিও সাধারণ পরিষদের সভাপতি কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন না, তবু বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা তৈরি, আলোচনার সমন্বয় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সভাপতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই দায়িত্ব বাংলাদেশকে যেমন আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ভূমিকা রাখার সুযোগ দেবে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য বিমোচন, টেকসই উন্নয়ন, অভিবাসন ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়নের মতো বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য নতুন যাত্রা, নতুন সম্ভাবনা ও নতুন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা থেকে জলবায়ু কূটনীতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও অবদান তুলে ধরার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে বিশ্বদরবারে ব্র্যান্ডিং করার সুযোগও কাজে লাগাতে চায় ঢাকা।

সব মিলিয়ে ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি মর্যাদাপূর্ণ পদ নয়; বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশের সক্ষমতা, স্বার্থ ও নতুন পরিচয় তুলে ধরার একটি বড় সুযোগ। আগামী এক বছর এই সুযোগ বাংলাদেশ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে বিশ্বমঞ্চে নতুন বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের পরবর্তী অধ্যায়।