ডলার কারসাজির অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, তদন্তে মিলেছে নানা অনিয়ম

ভিন্ন বিনিময় হারে ডলার কেনাবেচায় প্রায় ৫৫ কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগ; ভুয়া চিকিৎসা বিল ও শিক্ষাছুটি নিয়েও প্রশ্ন
টুইট ডেস্ক: বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা মজুত ও কোষাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক শাহনেওয়াজ সুমনের বিরুদ্ধে ডলার কেনাবেচায় অনিয়ম, সরকারি অর্থের অপব্যবহার, চিকিৎসা বিল নিয়ে জালিয়াতি এবং শিক্ষাছুটির নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ একাধিক তদন্তে এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৯ মে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির কাছে ৮ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার ১১০ টাকা দরে বিক্রি করে। একই দিনে ব্যাংকটি ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার ১১৬ টাকা ৪৬ পয়সা দরে কিনেছে। একই মূল্য তারিখে ভিন্ন বিনিময় হারে এসব লেনদেনের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ৫৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওই দিনই দেশে প্রথমবারের মতো ‘ক্রলিং পেগ’ বিনিময় হার ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তদন্তে বলা হয়, লেনদেনের ক্ষেত্রে আগের তারিখ দেখিয়ে চুক্তি করা, প্রয়োজনীয় স্বাক্ষরের ঘাটতি এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার মতো অনিয়মও ঘটেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথিতে আরও বলা হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার বিবরণী নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানোর বিধান থাকলেও দীর্ঘ সময় তা যথাযথভাবে করা হয়নি। এতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে শাহনেওয়াজ সুমনের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় তৎকালীন একজন উপ-গভর্নরের যোগসাজশের অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাছুটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। নথি অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার মালয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পিএইচডি করার জন্য ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে ২০২৭ সালের জুলাই পর্যন্ত পূর্ণ বেতন-ভাতায় প্রেষণ দেওয়া হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট তিনি দেশে ফিরে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দেন। পিএইচডি সম্পন্ন না করেই ফিরে আসার বিষয়টি নিয়ে তদন্তে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রেষণে থাকার সময় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহণে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইলের পরিবর্তে ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহার করেছেন। এতে সংবেদনশীল তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
চিকিৎসা বিলের ক্ষেত্রেও তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চিকিৎসা ও ওষুধের নামে তিনি প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করেছেন। কিছু ওষুধের মাত্রা নিয়েও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে অসামঞ্জস্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ওষুধের দোকানের কম্পিউটারভিত্তিক বিক্রয়ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তার জমা দেওয়া বিলে হাতে লেখা ভাউচার ব্যবহারের বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাহনেওয়াজ সুমন। তার দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তে নেওয়ার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েই লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে অতিরিক্ত পরিচালক ও পরিচালকের স্বাক্ষর না থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হলে তিনি স্বাক্ষর থাকার দাবি করেন। পিএইচডি প্রসঙ্গে তিনি জানান, তিনি অভিসন্দর্ভ জমা দিয়ে দেশে ফিরেছেন এবং মৌখিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনে আবার বিদেশে যাবেন।
চিকিৎসা বিলের অভিযোগ প্রসঙ্গে সুমনের দাবি, বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ইসলামী ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে অর্থ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও তিনি দাবি করেন, তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ায় যথাযথ প্রক্রিয়াতেই ওই সুবিধা নিয়েছেন এবং এর সঙ্গে ডলার লেনদেনের কোনো সম্পর্ক নেই।
অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান অভিযোগগুলোকে বহুমুখী জালিয়াতি ও প্রতারণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, ডলার লেনদেনের অনিয়মের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকলে তাদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, অভ্যন্তরীণ তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া হলে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরাতে হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির পাশাপাশি তার সঙ্গে যোগসাজশে জড়িতদেরও চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নতুন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। তবে এতগুলো অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই শাহনেওয়াজ সুমনের অতিরিক্ত পরিচালক পদে পদোন্নতি পাওয়ার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।






