ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা: অদক্ষ নেতৃত্ব টিমকে ডিমোটিভেট করে: বদিউল আলম লিংকন

ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি রিকভারি, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, কমপ্লায়েন্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অধীনস্থদের দক্ষতা বৃদ্ধিই হওয়া উচিত একজন হেডের নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন সূচক।

ব‌দিউল আলম লিংকন: ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, “টার্গেট নয়, টিমের সক্ষমতাই বড়”। একজন দক্ষ বিভাগীয় প্রধান (ইউনিট/ডিপার্টমেন্ট হেড) কখনোই তার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের অযথা হতাশ, অপমানিত বা ডিমোটিভেট (কর্মস্পৃহাহীন) করেন না।

কোনো কর্মকর্তা কাজে দুর্বল হলে একজন প্রকৃত নেতা প্রথমে তার দুর্বলতার কারণ চিহ্নিত করেন এবং প্রয়োজনীয় ডাটা (তথ্য-উপাত্ত), এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম—ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থা), পোর্টফোলিও ডাটা (ঋণ ও গ্রাহকভিত্তিক তথ্য), ব্যবসায়িক তথ্য ও সঠিক দিকনির্দেশনা শেয়ার করে তাকে সক্ষম করে তোলেন।

বদমেজাজী, নেতিবাচক ও অদক্ষ হেড প্রায়ই ডাটা-ভিত্তিক সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে রাগ, অযৌক্তিক চাপ ও ভয় দেখানোর পথ বেছে নেন। এতে কর্মীদের মোটিভেশন (কর্মপ্রেরণা) কমে যায়, যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। 

ব্যাংকিং খাতে একজন হেডের দায়িত্ব শুধু টার্গেট (লক্ষ্যমাত্রা) নির্ধারণ করে অধীনস্থদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা নয়। বরং বিজনেস (ব্যবসা), রিকভারি (ঋণ আদায়), ক্রেডিট মনিটরিং (ঋণ পর্যবেক্ষণ), কমপ্লায়েন্স (নীতিমালা পরিপালন), অপারেশনাল পারফরম্যান্স (কার্যক্রমের ফলাফল) এবং সামগ্রিক পোর্টফোলিওর মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় তথ্য, বিশ্লেষণ ও সহায়তা নিশ্চিত করাই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়।
একজন দক্ষ হেড জানেন—ডাটা গোপন করে, অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়ে কিংবা ভুল ডাটা শেয়ার করে টেকসই পারফরম্যান্স (দীর্ঘমেয়াদি কার্যসম্পাদন) তৈরি করা যায় না। বরং সঠিক এমআইএস (ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থা), কাস্টমার ডাটা (গ্রাহক তথ্য), ডেলিনকোয়েন্সি স্ট্যাটাস (ঋণের বকেয়া অবস্থান), রিকভারি পজিশন (আদায়ের বর্তমান অবস্থা), বিজনেস পাইপলাইন (সম্ভাব্য ব্যবসার তালিকা) ইত্যাদি অধীনস্থদের সঙ্গে শেয়ার করে তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনের সক্ষমতা তৈরি করতে হয়।

অদক্ষ ও বদমেজাজী হেডের সবচেয়ে বড় সমস্যা

অন্যদিকে, একজন অদক্ষ, বদমেজাজী ও নেতিবাচক মানসিকতার হেড সাধারণত সমস্যা সমাধানের আগে সমস্যা তৈরি করেন। কোনো কাজের রুট কজ অ্যানালাইসিস (সমস্যার মূল কারণ বিশ্লেষণ) না করেই তিনি প্রথমে রাগী মেজাজ দেখান এবং অধীনস্থ কর্মকর্তাকে বলেন—“এখনই সব কাজ শেষ করতে হবে”।

এ ধরনের নেতৃত্বে বাস্তব কর্মপরিস্থিতি, কাজের পরিমাণ, জনবল, প্রয়োজনীয় ডাটা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সক্ষমতা বিবেচনা করা হয় না। শুধু চাপ সৃষ্টি করে দ্রুত ফলাফল চাওয়া হয়। অথচ ব্যাংকিংয়ের মতো রিস্ক-সেন্সিটিভ (ঝুঁকিনির্ভর) খাতে তাড়াহুড়ো করে কাজ করানো কখনোই কার্যকর ব্যবস্থাপনার উদাহরণ হতে পারে না।

আরও উদ্বেগজনক হলো—এ ধরনের হেড অনেক সময় ছুটি (লিভ) নেওয়ার বিষয়েও অযথা বাড়াবাড়ি করেন। একজন কর্মকর্তা নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা অনুযায়ী ছুটির অধিকার রাখলেও সেটিকে ব্যক্তিগত অনুগ্রহের মতো দেখানো, ছুটি নেওয়ার জন্য অপরাধবোধ তৈরি করা কিংবা অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করা কর্মপরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

একইভাবে, অধীনস্থ কর্মকর্তার বেতন (স্যালারি), প্রমোশন নিয়ে খোঁটা দেওয়া একজন হেডের নেতৃত্বের দুর্বলতারই প্রকাশ। একজন কর্মীর বেতন তার পেশাগত পারিশ্রমিক; সেটিকে অপমান বা চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কোনো সুস্থ কর্পোরেট কালচার (প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ভুল ডাটা দিয়ে দক্ষতা প্রদর্শনের চেষ্টা আরও বিপজ্জনক

সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো—কিছু অদক্ষ হেড নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করতে গিয়ে অধীনস্থদের ভুল, অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর ডাটা (তথ্য-উপাত্ত) শেয়ার করেন। এটি শুধু নেতৃত্বের দুর্বলতা নয়; ব্যাংকিং খাতে এর সঙ্গে ডাটা গভর্ন্যান্স (তথ্য ব্যবস্থাপনা), কমপ্লায়েন্স (নীতিমালা পরিপালন), রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা) এবং অ্যাকাউন্টেবিলিটি (জবাবদিহি) সরাসরি জড়িত।

ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোনো কর্মকর্তা যদি সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে ভুল রিপোর্টিং, ভুল বিশ্লেষণ, ভুল ক্রেডিট সিদ্ধান্ত, ভুল রিকভারি পরিকল্পনা কিংবা ভুল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত তৈরি হতে পারে। পরবর্তীতে সেই ব্যর্থতার দায় আবার অধীনস্থ কর্মকর্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে সেটি নেতৃত্বের আরও বড় ব্যর্থতা।
একজন প্রকৃত নেতা কখনোই “আমি বেশি জানি”—এটি প্রমাণ করার জন্য তথ্য আটকে রাখেন না। বরং নিজের জ্ঞান ও তথ্য টিমের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে পুরো ইউনিটকে দক্ষ করে তোলেন।

পদোন্নতি ও ছুটির বিষয়ে নীরবতাও এক ধরনের দুর্বল নেতৃত্ব

প্রমোশন (পদোন্নতি), লিভ (ছুটি), পারফরম্যান্স অ্যাপ্রেইজাল (কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন) এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে অধীনস্থরা যৌক্তিক প্রশ্ন করলে একজন হেডের দায়িত্ব হলো পরিষ্কারভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা।

কিন্তু অদক্ষ হেড অনেক সময় এসব বিষয়ে “বোবা ভাব” দেখান। না স্পষ্ট উত্তর দেন, না সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেন। এতে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা, অনিশ্চয়তা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়।

একজন হেড যদি কর্মীর ন্যায্য প্রমোশন (পদোন্নতি), ছুটি, সুযোগ-সুবিধা ও পেশাগত উন্নয়নের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতেই অনাগ্রহী হন, তাহলে তিনি শুধু একজন দুর্বল ম্যানেজার নন; তিনি তার পিপল ম্যানেজমেন্ট (মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করছেন না।
রাগ দিয়ে টিম পরিচালনা করা যায় না

একজন বদমেজাজী হেড মনে করতে পারেন, রাগ দেখালে কর্মীরা দ্রুত কাজ করবে। বাস্তবে দীর্ঘমেয়াদে এর বিপরীত ফল হতে পারে। নিয়মিত রাগ, অপমান, হুমকিসূচক আচরণ ও অযৌক্তিক চাপ কর্মীদের মোটিভেশন (কর্মপ্রেরণা) কমিয়ে দেয়। এক পর্যায়ে অধীনস্থরা সমস্যার কথা জানাতে ভয় পান, ভুল লুকানোর প্রবণতা তৈরি হয়, নতুন ধারণা দেওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং টিম কমিউনিকেশন (দলীয় যোগাযোগ) দুর্বল হয়ে পড়ে।

এতে হেড হয়তো মনে করেন সবাই তার নির্দেশ মেনে চলছে; কিন্তু বাস্তবে তিনি একটি ফিয়ার-ড্রিভেন কালচার (ভয়ভিত্তিক কর্মসংস্কৃতি) তৈরি করছেন।

এ ধরনের পরিবেশ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ব্যাংকিংয়ে কোনো সমস্যা গোপন রাখা বা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভবিষ্যতে বড় অপারেশনাল রিস্ক (কার্যক্রমগত ঝুঁকি), ক্রেডিট রিস্ক (ঋণঝুঁকি) কিংবা কমপ্লায়েন্স রিস্ক (নীতিমালা লঙ্ঘনের ঝুঁকি) তৈরি করতে পারে।

মালিকপক্ষ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার করণীয়

কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে ইউনিট হেড (ইউনিট প্রধান) কিংবা ডিপার্টমেন্ট হেড (বিভাগীয় প্রধান) নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ব্যবসার পরিমাণ বা টার্গেট অর্জনকে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়।
একজন হেডের মূল্যায়নে লিডারশিপ কোয়ালিটি (নেতৃত্বের গুণ), পিপল ম্যানেজমেন্ট (মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা), কমিউনিকেশন স্কিল (যোগাযোগ দক্ষতা), ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স (আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা), ডাটা গভর্ন্যান্স (তথ্য ব্যবস্থাপনা), টিম ডেভেলপমেন্ট (দল উন্নয়ন), কমপ্লায়েন্স কালচার (নীতিমালা পরিপালনের সংস্কৃতি) এবং এমপ্লয়ি এনগেজমেন্ট (কর্মীদের সম্পৃক্ততা)-কেও গুরুত্ব দিতে হবে।

কারণ একজন অদক্ষ হেড হয়তো কিছুদিন টার্গেট (লক্ষ্যমাত্রা) পূরণ করতে পারেন, কিন্তু যদি তার নেতৃত্বে দক্ষ কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েন, কাজের পরিবেশ নষ্ট হয়, তথ্যের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমে যায়—তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সেই হেড প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়, বরং অ্যাসেটের পরিবর্তে লায়াবিলিটি (সম্পদের পরিবর্তে দায়) হয়ে দাঁড়াতে পারেন।

সুতরাং ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের পদ কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা নয়। এটি দায়িত্ব, জবাবদিহি ও টিমকে সক্ষম করে তোলার অবস্থান। একজন দক্ষ হেড তথ্য দিয়ে শক্তিশালী করেন, সমস্যা সমাধানে পাশে দাঁড়ান, ন্যায্য সুযোগের জন্য কথা বলেন এবং টিমকে টার্গেট অর্জনের সক্ষমতা দেন।

আর একজন বদমেজাজী, নেতিবাচক, তথ্য-অসহযোগী, কর্মীবান্ধব নন এমন এবং দায়িত্ব পালনে নীরব হেড নিজের পদমর্যাদা দিয়ে হয়তো কিছুদিন অধীনস্থদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন; কিন্তু তিনি প্রকৃত অর্থে নেতৃত্ব দিতে পারেন না।

কারণ ভয় দেখিয়ে কর্মীকে দিয়ে কাজ করানো যায়, কিন্তু আস্থা, সম্মান ও সঠিক তথ্য ছাড়া একটি দক্ষ টিম তৈরি করা যায় না। আর দক্ষ টিম ছাড়া কোনো ব্যাংকিং ইউনিটের টেকসই ব্যবসায়িক সাফল্যও সম্ভব নয়।

অন্যদিকে কমপ্লায়েন্স (নীতিমালা পরিপালন) কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় নয়। ভুল ডাটা, অসম্পূর্ণ তথ্য, দুর্বল ডকুমেন্টেশন, অনিয়মিত মনিটরিং বা প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন কাম‌্য নয়। বরং গ্রাহকভিত্তিক সমাধানে অধীনস্থদের কার্যকর সহায়তা করা প্রয়োজন।

তাই একজন হেডের প্রকৃত পারফরম্যান্স (কর্মদক্ষতা) শুধু তার নিজের টার্গেট অর্জনে নয়; বরং তার নেতৃত্বে ব্যবসা কতটা বেড়েছে, রিকভারি কতটা উন্নত হয়েছে, খেলাপি ঋণ কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, কমপ্লায়েন্স কতটা শক্তিশালী হয়েছে, ঝুঁকি কতটা কমেছে এবং অধীনস্থ কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও কর্মস্পৃহা কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে—এসব সূচকের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা উচিত।

কারণ একজন হেড ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে কাজ আদায় করতে পারেন, কিন্তু ব্যবসা, রিকভারি, কমপ্লায়েন্স ও টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন আস্থা, সঠিক ডাটা, সহযোগিতা, জবাবদিহি এবং দক্ষ নেতৃত্ব।