মানসিক চাপ মোকাবিলায় পুলিশকে দক্ষ করতে আরএমপির প্রশংসনীয় উদ্যোগ

ছবি: আরএমপি

মনোসামাজিক পরিচর্যা প্রশিক্ষণে গুরুত্ব পেল পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপ মোকাবিলা, আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত প্রতিরোধ ও জনবান্ধব পুলিশিং

বদিউল আলম লিংকন: আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা এবং জনগণের প্রতি আরও মানবিক ও সংবেদনশীল আচরণে দক্ষ করে তুলতে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘মনোসামাজিক পরিচর্যা বিষয়ক প্রশিক্ষণ ২০২৬’। পুলিশ সদস্যদের পেশাগত চাপ মোকাবিলা, মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা এবং সেবা প্রত্যাশীদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বুঝে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রশিক্ষণকে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বুধবার (১৯ আগস্ট) সকাল ১০টায় পুলিশ লাইন্সের পিওএম সম্মেলন কক্ষে আরএমপি ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের রাজশাহী শহর এরিয়া ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের যৌথ আয়োজনে এ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আরএমপির পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির। প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুরশিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব। আরএমপির বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা প্রশিক্ষণে অংশ নেন।

ছবি: আরএমপি

পুলিশের মানসিক সুস্থতায় নতুন গুরুত্ব

পুলিশের দায়িত্ব সাধারণত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিয়মিত দায়িত্ব, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং নানা ধরনের মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ফলে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ধরে রাখতে তাদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আরএমপির পক্ষ থেকে মনোসামাজিক পরিচর্যা বিষয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজনকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপ চিহ্নিত করা, তা মোকাবিলা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে প্রশিক্ষণটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শুধু আইন প্রয়োগ নয়, মানবিক আচরণও গুরুত্বপূর্ণ

প্রশিক্ষণের উদ্বোধনী বক্তব্যে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির বলেন, পুলিশ শুধু আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থেকে দায়িত্ব পালন করে না। সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অনেক সময় প্রচলিত আইনের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক জটিল সমস্যার সমাধানেও পুলিশকে ভূমিকা রাখতে হয়।

তিনি বলেন, থানায় বা পুলিশের কাছে সেবা নিতে আসা অনেক মানুষ পারিবারিক দ্বন্দ্ব, নির্যাতন, আর্থিক সংকটসহ নানা কারণে মানসিক ট্রমা ও অস্থিরতার মধ্যে থাকেন। এ অবস্থায় পুলিশ সদস্যরা যদি তাদের মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতি বুঝে সংবেদনশীল ও সহানুভূতিশীল আচরণ করেন, তাহলে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা আরও বাড়বে।

জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক উন্নয়নে এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন বিপদগ্রস্ত মানুষ থানায় এসে শুধু আইনি সহায়তাই চান না; অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিরাপত্তা, আস্থা ও মানবিক আচরণও প্রত্যাশা করেন। সেই জায়গায় পুলিশের মনোসামাজিক সচেতনতা জনবান্ধব পুলিশিংকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

২৪ ঘণ্টার দায়িত্বে মানসিক চাপ মোকাবিলা

পুলিশ সদস্যদের কর্মপরিবেশের কঠোরতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা নিরন্তর দায়িত্ব পালন করেন এবং তাদের কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও পেশাগত চাপের কারণে তাদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

এ ধরনের বাস্তবতায় মনোসামাজিক সহায়তা ও মানসিক সুস্থতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ শুধু ব্যক্তিগত কল্যাণের জন্য নয়, পুলিশের সামগ্রিক কর্মদক্ষতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মানসিকভাবে সুস্থ ও চাপ মোকাবিলায় সক্ষম একজন পুলিশ সদস্য সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে তুলনামূলকভাবে স্থির ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত প্রতিরোধে সচেতনতা

প্রশিক্ষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত প্রতিরোধ। দীর্ঘদিনের কর্মচাপ, ব্যক্তিগত সমস্যা, পারিবারিক জটিলতা কিংবা মানসিক হতাশা অনেক সময় মানুষের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। পুলিশ সদস্যদের এ বিষয়ে সচেতন করে তোলা এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তা নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

পুলিশ কমিশনারও এ ধরনের প্রশিক্ষণকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত প্রতিরোধে সময়োপযোগী হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি সহকর্মীর আচরণে মানসিক সংকটের লক্ষণ দেখা গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও জোরালোভাবে সামনে আসে।

আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা ও পরামর্শের গুরুত্ব

বর্তমান সময়ে মানসিক চাপ ও হতাশা মোকাবিলায় আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার গুরুত্বও বেড়েছে। একজন পুলিশ সদস্যকে প্রতিদিন নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়। কখনো অপরাধী, কখনো ভুক্তভোগী, আবার কখনো পারিবারিক বা সামাজিক সংকটে থাকা মানুষের সঙ্গে তাকে কথা বলতে হয়।

তাই নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অন্যের আবেগ ও মানসিক অবস্থাও বুঝতে পারা পুলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। যথাযথ পরামর্শ প্রদানের সক্ষমতা থাকলে পুলিশ সদস্যরা শুধু নিজের মানসিক চাপই সামলাতে পারবেন না, সেবা নিতে আসা মানুষকেও প্রয়োজনীয় সহায়তা ও দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন।

মাদক প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ

মাদক সমস্যার সমাধানেও শুধু জেল-জরিমানা কিংবা কঠোর আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয় বলে মত দেন পুলিশ কমিশনার। এ ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

মাদকাসক্তির পেছনে থাকা পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিক কারণগুলো বিবেচনায় নিয়ে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। মনোসামাজিক পরিচর্যার মতো প্রশিক্ষণ পুলিশ সদস্যদের এসব বিষয় আরও গভীরভাবে বুঝতে সহায়তা করতে পারে।

প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান

আরএমপির প্রায় তিন হাজার পুলিশ সদস্যের মধ্যে প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। তাঁর এ আহ্বান প্রশিক্ষণটিকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর পরিসরে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছে।

প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া সদস্যরা নিজেদের কর্মক্ষেত্রে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের পাশাপাশি সহকর্মীদের মধ্যেও তা ছড়িয়ে দিতে পারলে পুরো বাহিনীর মধ্যে মনোসামাজিক সচেতনতা তৈরি হবে। এর মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের নিজেদের মানসিক সুস্থতা রক্ষার পাশাপাশি জনগণকে আরও মানবিক, সংবেদনশীল ও কার্যকর সেবা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে।

প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা

আরএমপির এই উদ্যোগের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো—এখানে পুলিশ সদস্যদের শুধু আইন প্রয়োগকারী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনের চাপ, মানসিক ক্লান্তি, আবেগীয় সংকট এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পুলিশ সদস্যরা যাতে সুস্থ ও দক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে জনগণের মানসিক অবস্থা বুঝে সহানুভূতিশীল আচরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় এ প্রশিক্ষণ জনবান্ধব পুলিশিং প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের মানসিক সুস্থতা ও মানবিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে আরএমপির এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) মো. ফারুক হোসেন এবং উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর)-এর দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম, পিপিএম।

পুলিশের মতো উচ্চচাপের পেশায় কর্মরত সদস্যদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত এমন প্রশিক্ষণ আয়োজন করা গেলে তা একদিকে যেমন পুলিশ সদস্যদের কর্মদক্ষতা ও মানসিক স্থিতিশীলতা বাড়াবে, অন্যদিকে জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক আরও আস্থাপূর্ণ ও মানবিক করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।