তীব্র গরমে বিপাকে ইউরোপের ব্যবসা: ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না প্রচলিত বীমা

তীব্র গরমে বিক্রি ও উৎপাদন কমলেও প্রচলিত ব্যবসায়িক বীমায় মিলছে না ক্ষতিপূরণ; সমাধান হিসেবে বাড়ছে তাপমাত্রাভিত্তিক বীমার আলোচনা
বিশ্ব ডেস্ক: ইউরোপজুড়ে একের পর এক তাপপ্রবাহে ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতির পরিমাণ বাড়লেও সেই ক্ষতির বড় অংশই প্রচলিত বীমার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তীব্র গরমে মানুষের চলাচল ও ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়া, শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা হ্রাস, পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং শিল্পকারখানায় শীতলীকরণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসাগুলো আর্থিক চাপে পড়ছে। অথচ সম্পত্তির সরাসরি ক্ষতি না হওয়ায় এসব লোকসানের বড় অংশের জন্য প্রচলিত ব্যবসায়িক বিঘ্ন বীমা থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়া কঠিন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপে চলতি বছরের পঞ্চম তাপপ্রবাহ চলছে। ইতালির পাদুয়া শহরের আতিথেয়তা খাতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে বাইরে বসে পানীয় ও খাবার গ্রহণের যে সংস্কৃতি ছিল, তীব্র গরমের কারণে সেই সময় অনেকটাই হারিয়ে গেছে। মানুষ এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের ভেতরে অবস্থান করায় বাইরের আসন ও উন্মুক্ত জায়গাগুলো ফাঁকা থাকছে।
পাদুয়া ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৬০০টি আতিথেয়তা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত এক জরিপে ৮০ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহে প্রায় ২০ শতাংশ বিক্রি কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, বিক্রিতে এ ধরনের পতন সরাসরি তাদের মুনাফার ওপর আঘাত করছে।
মুডিসের হিসাব অনুযায়ী, গত গ্রীষ্মে ইউরোপের তাপপ্রবাহে অর্থনৈতিক উৎপাদন কমে প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ইউরোর ক্ষতি হয়েছিল। অথচ ওই ক্ষতির বিপরীতে বীমা থেকে পরিশোধ করা হয়েছিল মাত্র প্রায় ৫০ কোটি ইউরো। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ক্ষতির তুলনায় বীমা সুরক্ষার পরিমাণ ছিল অত্যন্ত নগণ্য।
মার্শের জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোয়েনজা সুরমিনস্কি বলেন, তাপ নিজে প্রচলিত অর্থে বীমাযোগ্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয় না। বন্যা বা ঝড়ের মতো তাপপ্রবাহ সাধারণত বড় ধরনের সরাসরি ভৌত ক্ষতি না করলেও এর কারণে সৃষ্ট আর্থিক ও পরিচালনাগত বিঘ্নের মাত্রা অনেক সময় একই রকম গুরুতর হতে পারে।
ইউরোপের বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য ২০২৩ সালে প্রায় ৯ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, মাত্র ২৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি বীমার সঙ্গে ব্যবসায়িক বিঘ্নের সুরক্ষা ছিল। আর ধর্মঘটের মতো সম্পত্তির ক্ষতি ছাড়াই ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঘটনাকে অন্তর্ভুক্ত করে এমন বীমা ছিল মাত্র ১৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের।
তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু ব্যবসার বিক্রি কমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অতিরিক্ত গরমে ট্রেন চলাচলে বিলম্ব, কৃষিতে উৎপাদন কমে যাওয়া, কারখানায় শীতলীকরণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মীদের উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার মতো নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ফলে তাপপ্রবাহ ধীরে ধীরে ইউরোপের বিভিন্ন খাতের জন্য একটি বড় ব্যবসায়িক ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।
দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল প্রকাশের সময়ও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত গরমের প্রভাবের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সুইডেনের দোকানসজ্জা সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আইটিএবি গ্রুপ, ইতালির সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বুজ্জি এবং ফ্রান্সের অর্থপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডলাইন।
জটিল হয়ে উঠছে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপপ্রবাহকে আলাদা একটি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করাও কঠিন। কারণ অতিরিক্ত গরম অনেক সময় খরা, দাবানল ও পানির সংকটের সঙ্গে একযোগে কাজ করে। ফলে একটি নির্দিষ্ট ক্ষতির ঘটনা চিহ্নিত করে তার বিপরীতে বীমা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ। রয়টার্সের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১১ আগস্ট পশ্চিম ইউরোপের গড় তাপমাত্রা ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ সালের গড়ের তুলনায় প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
পরিবেশগত তথ্য প্রকাশকারী সংস্থা সিডিপির সংগৃহীত তথ্যেও ঝুঁকিটির ব্যাপকতা উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণে থাকা কোম্পানিগুলোর ৩৫ শতাংশ তাপপ্রবাহকে ব্যবসার জন্য ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। উৎপাদন, সেবা, অবকাঠামো ও খাদ্যসংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মতো ঘটনায় কিছু ভৌত ক্ষতি বীমার আওতায় এলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে হারানো বিক্রি বা ক্রেতাদের কমে যাওয়া কার্যক্রমের প্রকৃত ক্ষতি পুষিয়ে ওঠে না। কারণ ব্যবসার সবচেয়ে বড় ক্ষতি অনেক সময় এমন রাজস্ব, যা আর কখনো তৈরি হয়নি।
বিকল্প হিসেবে তাপমাত্রাভিত্তিক বীমা
এই সুরক্ষা ঘাটতি পূরণে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তাপমাত্রাভিত্তিক বা সূচকনির্ভর বীমার দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। এ ধরনের বীমায় নির্দিষ্ট তাপমাত্রার সীমা অতিক্রম করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করা হয়। প্রচলিত বীমার মতো দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করার প্রয়োজন হয় না।
কেবিভি রিসার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরোপের সূচকনির্ভর বীমার বাজার ২০৩১ সালের মধ্যে ৭ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০২৫ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে এ বাজারে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
কৃষি খাতে এ ধরনের বীমার ব্যবহার ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে ফসলের উৎপাদন বা গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা কমে গেলে নির্ধারিত তাপমাত্রার সীমার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা পরিবহন, শিল্প ও কর্মীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এ ধরনের বীমার বিস্তারের সম্ভাবনা দেখছেন।
সুইস রির যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের সরকারি খাতের সমাধান বিভাগের প্রধান এইডান কের বলেন, তাপমাত্রাভিত্তিক বীমা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বীমার ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তীব্র গরমের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে নিজেদের কার্যক্রমেও পরিবর্তন আনতে হবে। শীতলীকরণ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, কর্মস্থলের নকশায় পরিবর্তন এবং সরবরাহব্যবস্থাকে সম্ভাব্য তাপপ্রবাহের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে আগাম যাচাই করার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।
মার্শের সুরমিনস্কির মতে, ক্ষতি হওয়ার পর তা পূরণের চেষ্টা করার চেয়ে আগে থেকেই ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষতি এড়ানোই হবে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। ইউরোপে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও ঘনত্ব বাড়তে থাকায় ব্যবসার জন্য এই প্রস্তুতি এখন আর ঐচ্ছিক নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে উঠছে।






