সরকারের ছয় মাস: সাফল্যের খতিয়ান, সামনে বিদ্যুৎ-জ্বালানি বড় চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও পররাষ্ট্রনীতিতে নানা উদ্যোগের দাবি; তবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

টুইট ডেস্ক: আজ ১৬ আগস্ট বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ২১২টি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেয় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার।

সরকারের প্রথম ছয় মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রস্তুত করা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, জনকল্যাণ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সংস্কার ও পররাষ্ট্রনীতিতে বিভিন্ন উদ্যোগ ও অর্জনের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

সরকারের দাবি, ব্যক্তি-কেন্দ্রিকতার পরিবর্তে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নেতাদের ছবি ব্যবহারের প্রচলন বন্ধ, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি গাড়ির পরিবর্তে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার এবং সরকারি সফর ও আপ্যায়ন ব্যয় কমানোর মতো বিষয়ও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি

২০২৬-৩১ মেয়াদে প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী দেশে ও বিদেশে মিলিয়ে ৯৩ লাখ ২৭ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড

সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও স্বাস্থ্য কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, ছয় মাসে ৬৭ হাজার ২৭৮টি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে ৪১ লাখ নারীকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

এ ছাড়া প্রায় ১৪ লাখ ৩৪ হাজার কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে বলে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করা হয়েছে। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, ডিজিটাল ক্লাসরুম, ফ্রি ওয়াই-ফাই, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ এবং উপবৃত্তি বাড়ানোর মতো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ হেলথ কেয়ারার ও ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড চালুর লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ডেটা আর্কিটেকচার তৈরির কাজও শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তা

সরকারের হিসাবে, প্রথম ছয় মাসে ২ কোটি ২২ লাখের বেশি চারা রোপণ করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ২ হাজার ১৬৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের তথ্য দেওয়া হয়েছে।

২৮ জুন পর্যন্ত সরকারি খাদ্যগুদামে ২২ লাখ ১০ হাজার ৯৪৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুত ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটই বড় চ্যালেঞ্জ

তবে সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা, সার কারখানা ও সিএনজি স্টেশনেও।

এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ২৭ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া সংসদ অধিবেশনে আগামী ১০ বছরের জ্বালানি সংকট সমাধানের পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।

অন্যদিকে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রধানমন্ত্রীর ছয় মাসের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে বিকল্প পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। ফলে সরকারের ছয় মাস পূর্তির সময়ে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক বিতর্কও নতুন মাত্রা পেয়েছে।

সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন খাতে একাধিক উদ্যোগ ও অগ্রগতির দাবি থাকলেও বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও ঘোষিত পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়নই আগামী দিনের বড় পরীক্ষার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।