কওমি মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা: এখনই কার্যকর উদ্যোগের সময়

নির্যাতনের অভিযোগে উদ্বেগ, জবাবদিহি ও শিশু সুরক্ষা কাঠামো জোরদারের দাবি
টুইট ডেস্ক: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে ঘিরে কওমি মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভিডিওটির স্থান, সময় ও সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব না হলেও এতে একজন শিক্ষককে কয়েকজন শিশুকে মারধর করতে দেখা যাওয়ার দাবি করা হয়েছে। ঘটনাটি শিশু সুরক্ষা, নজরদারি এবং জবাবদিহির প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা একটি বৃহৎ বাস্তবতা। লাখো শিক্ষার্থী, বিশেষ করে দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম শিশু এসব প্রতিষ্ঠানে আবাসিক ও অনাবাসিকভাবে শিক্ষা গ্রহণ করছে। অভিভাবকেরা ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং নিরাপদ পরিবেশের প্রত্যাশায় সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজ—সবার যৌথ দায়িত্ব।
বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, তাদের অধীনে নিবন্ধিত মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজার ৭৩০টি এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। এছাড়া অন্যান্য কওমি শিক্ষা বোর্ডের আওতায়ও বিপুলসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এত বৃহৎ শিক্ষাব্যবস্থায় শিশু সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে অভিযোগ প্রকাশ পাওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত নয়। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসা শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয় বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসিক প্রতিষ্ঠানে থাকা অনেক শিশু ভয়, সামাজিক সংকোচ কিংবা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কারণে নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ করতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রেই অভিভাবকেরাও সামাজিক চাপ বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির কথা বিবেচনা করে অভিযোগ জানাতে দ্বিধাগ্রস্ত হন। ফলে প্রকাশিত ঘটনার বাইরেও অপ্রকাশিত ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়।
২০১১ সালে উচ্চ আদালত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা জারি করে। শিশু অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কওমি মাদ্রাসাসহ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব নির্দেশনার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ। সেই অনুযায়ী প্রতিটি শিশুকে শারীরিক ও মানসিক সহিংসতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের অংশ। কোনো প্রতিষ্ঠানের ধরন বা পরিচালন কাঠামো এই দায়িত্ব থেকে রাষ্ট্রকে অব্যাহতি দেয় না।
বিশ্লেষকদের মতে, সব কওমি মাদ্রাসাকে একইভাবে মূল্যায়ন করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি বিচ্ছিন্ন ঘটনার আড়ালে প্রকৃত সমস্যাকেও অস্বীকার করা উচিত নয়। দেশের বহু কওমি মাদ্রাসা নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, সেখানে দ্রুত তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় শিশুদের জন্য নিরাপদ অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা, অভিযোগ তদন্তের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, গুরুতর ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করা এবং শিশু সুরক্ষা বিষয়ে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলোরও শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি শিশু সুরক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, শিশুদের প্রতি সহিংসতাকে ‘শাসন’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মানবিক, সহমর্মিতাপূর্ণ ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সবার সমান দায়িত্ব।






