বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

অর্থ পাচার ও ধংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ। স্বাস্থ্য খাতে বড় সংস্কার: শয্যা বৃদ্ধি ও চিকিৎসা খরচ হ্রাসের ঘোষণা।

নিজস্ব প্রতিবেদক: সুখী-সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দেশের সকল স্তরের মানুষকে দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

​প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্রিফ করেন।

​সবাইকে নিয়ে একসাথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়

​বৈঠকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধি দল তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, ভূমির অধিকার ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি ও সমস্যার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিস্তারিত তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ধৈর্য ও মনোযোগ সহকারে তাঁদের কথা শোনেন।

​উপ-প্রেস সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন,

​”আমরা এমন একটি বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করছি যেখানে কোনো জাতি-গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য থাকবে না। আমি কাউকে আলাদা মনে করি না। সবাইকে সাথে নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।”

​প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে আরও বলেন, ​”এখনকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক টিকে থাকার লড়াইটা অনেক বড়। এই লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। অতীতের ক্ষত কাটিয়ে দেশ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, তাই এখন পিছিয়ে পড়ার সুযোগ নেই।”

​ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিবর্গের উত্থাপিত প্রধান দাবি সমূহ

​মতবিনিময় সভায় দেশের ১৭টি জেলা থেকে আগত ১৮টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠককালে তাঁদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি প্রধানমন্ত্রী বরাবর পেশ করা হয়-

১. সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ভূমির মালিকানা সমস্যা সমাধানে একটি স্বতন্ত্র ‘ভূমি কমিশন’ গঠন।

২. আদিবাসী অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে জাতীয় কনভেনশন আয়োজন।

৩. সংবিধানে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দের পরিবর্তে তাঁদের গোত্রভিত্তিক পরিচয় ও আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান।

৪. দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চল বা সরকারি প্রকল্পের নামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসতি উচ্ছেদ বন্ধ করা।

৫. তাঁদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার জন্য সহজ শর্তে বিশেষ ঋণ সুবিধা প্রদান এবং কেন্দ্রীয় কালচারাল সেন্টার স্থাপন।

​বিগত শাসনের ধ্বংসাত্মক রূপ ও চলমান সংস্কার

​বিরাজমান সমস্যাগুলোর পেছনে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দায় টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ​”দেশ আজ এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি। অতীতের সরকার দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনৈতিক কাঠামোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে গেছে। প্রতি বছর দেশ থেকে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার করা হতো। যদি এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার না হতো, তবে আজ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উন্নয়নসহ দেশের সিংহভাগ মৌলিক সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হতো।”

​তিনি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন তোলেন, বিগত ১৭ বছর ধরে কেন এই সমস্যাগুলো চিহ্নিত বা সমাধান করা হয়নি? প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে বলেন, তাঁর সরকার প্রথম দিন থেকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধানযোগ্য সমস্যাগুলো একে একে গুরুত্ব সহকারে সমাধানের চেষ্টা করছে। জনগণের বিপুল প্রত্যাশার চাপ সামলে ভঙ্গুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে পুনর্গঠনে কাজ শুরু হয়েছে।

​স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা

​জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উপজেলা পর্যায়ে যে ৩১ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যাত্রা শুরু করেছিলেন, পরবর্তীতে বিএনপি সরকার তা ৫০ শয্যায় উন্নীত করে। বর্তমান সরকার এটিকে আরও আধুনিক করে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিগত সরকারের অবহেলায় ইউনিয়নভিত্তিক কমিউনিটি কেন্দ্রগুলোর জীর্ণদশা দূর করারও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

​একই সাথে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া চিকিৎসা খরচ নিয়ন্ত্রণে আনতে কিডনি ডায়ালাইসিস ও হার্টের রিংয়ের মতো অতি জরুরি জীবনরক্ষাকারী মেডিকেল যন্ত্রাংশের ওপর আরোপিত শুল্ক ও কর হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

​আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক) বিজন কান্তি সরকার, সংসদ সদস্য আন্না মিনজ এবং বিশিষ্ট সংস্কৃতি কর্মী সঞ্জীব দ্রংসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।