৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকায় ধসে পড়তে পারে ৭২ হাজার ভবন

দেড় বছরে দেশে ৫২টি ভূমিকম্প; নরম মাটি, দুর্বল ভবন ও গ্যাসলাইনের ঝুঁকিতে সতর্ক বিশেষজ্ঞরা

টুইট ডেস্ক: গত দেড় বছরে বাংলাদেশে মোট ৫২টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, যার মধ্যে ৩৯টির উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের অভ্যন্তরে। রিখটার স্কেলে এসব ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ২ দশমিক ৫ থেকে ৫ দশমিক ৭। ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তি এবং দীর্ঘদিন বড় ধরনের ভূকম্পন না হওয়ায় রাজধানী ঢাকা বড় দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির জরিপ অনুযায়ী, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলে ঢাকার প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। একই সঙ্গে গ্যাসলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়েছে

আবহাওয়া অধিদফতরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে দেশে ৫২ বার ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি সিলেট অঞ্চলে, নরসিংদীতে ৫টি এবং রংপুরে ৪টি। এছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত, ভুটান ও মিয়ানমারেও কয়েকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে।

ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির বলেন, ২০১৫-১৬ থেকে ২০২০-২১ সময়কালে দেশে বছরে গড়ে ১০টির কম ভূমিকম্প হতো, কিন্তু গত দুই-তিন বছরে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রায় ১৫০ বছর ধরে এ অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প না হওয়ায় বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ঢাকার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে নরম মাটি

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-এর পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, রাজউকের আওতাধীন প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা নরম ও ভরাট মাটির ওপর গড়ে উঠেছে। এসব এলাকায় ভূমিকম্পের কম্পন তুলনামূলক বেশি অনুভূত হতে পারে এবং ভবনের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ে।

তিনি আরও জানান, রাজউকের অধীন এলাকায় প্রায় ২১ লাখ ভবনের মধ্যে ৬ লাখ বহুতল ভবন রয়েছে। এর বড় অংশই ভবন নির্মাণ বিধিমালা যথাযথভাবে মেনে নির্মিত হয়নি। ফলে ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় মজবুতীকরণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

গ্যাসলাইন হতে পারে বড় বিপদ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের পর সবচেয়ে বড় দ্বিতীয়িক দুর্যোগ হতে পারে গ্যাস বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড। ড. আনসারী বলেন, ভূমিকম্পের পর গ্যাসলাইন দ্রুত বিচ্ছিন্ন করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বাতাসে গ্যাস ছড়িয়ে বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি না হয়।

স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুতির তাগিদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, বড় ধরনের ভূমিকম্পে হাজার হাজার ভবন ধসে পড়লে শুধু সরকারি জনবল দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। এজন্য আগেভাগেই প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দল গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মূল বার্তা:

* ভূমিকম্পের আগাম পূর্বাভাস নির্ভরযোগ্যভাবে দেওয়া সম্ভব নয়।

* ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে মানতে হবে।

* নরম ও ভরাট মাটির এলাকায় বিশেষ প্রকৌশল ব্যবস্থা নিতে হবে।

* পুরোনো ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা পরীক্ষা জরুরি।

* গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের জরুরি বিচ্ছিন্নকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

* প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক ও কমিউনিটি পর্যায়ের প্রস্তুতি বাড়াতে হবে।